আওয়ামী লীগ-হেফাজত দহরম মহরম: বেকায়দায় বাম’রা

সময় বাংলা ডেস্ক: ২০১৩ সালের ৫ মে ১৩ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ঢাকা অবরোধ শেষে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নিয়েই দেশের রাজনীতিতে ঝড় তুলেছিল কওমী মাদরাসা ভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শক্ত অবস্থানের কারণে তারা টিকে থাকতে পারেনি। রাতের আধাঁরেই তাদেরকে শাপলা চত্বর থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সেদিন রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হেফাজতের কয়েকশ লোককে হত্যা করেছে বলেও দাবি করেছিল হেফাজত। পরের দিন সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল যে, সরকারকে উৎখাত করতে বিএনপি-জামায়াতের ইশারায় হেফাজতের লোকজন শাপলা চত্বরে অবস্থান নিয়েছিল। এঘটনায় সারাদেশে হেফাজত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও গণহারে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার করা হয়েছিল সংগঠনটির মহাসচিব জুনাইদ বাবুনগরীসহ বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতাকে। বাবুনগরীকে রিমান্ডে নিয়ে অকথ্য নির্যাতন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ ছিল হেফাজতের। এরপর থেকেই সরকারের সঙ্গে চরম দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে হেফাজত। জানা গেছে, ৫ মে’র পর থেকেই সরকার সংগঠনটির আমির আল্লামা আহমদ শফীসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের ওপর একদিকে চাপ প্রয়োগ করে আর অপরদিকে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হাটহাজারী মাদরাসায় নিয়মিত আসা-যাওয়া শুরু করেন। যার ফলে শাপলা চত্বরের ঘটনার প্রতিবাদে বড় ধরণের কয়েকটি কর্মসূচি ঘোষণা করেও তা আবার প্রত্যাহার করে নেয় হেফাজত।

এতদিন যাদের বিরুদ্ধে সরকার উৎখাতের চেষ্টার অভিযোগ করা হয়েছিল, যাদেরকে মৌলবাদী বলে দিনরাত গালি দিত সেই হেফাজতে ইসলামের নেতাদেরই গত ১১ এপ্রিল গণভবনে ডেকে নিয়ে তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। হেফাজতে ইসলাম ও কওমী আলেমদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু দাবি প্রধানমন্ত্রী মেনে নেন। ওই দিন তিনি কওমী মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের স্বীকৃতির ঘোষণা দেন। সুপ্রিমকোর্ট থেকে ভাস্কর্য সরাতেও তাদের দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করেন। এরআগেও ২০১৬ সালে পাঠ্যবই প্রণয়নের আগে সরকারের কাছে হেফাজতের পক্ষ থেকে ১৬ দফা দাবি পেশ করা হয়েছিল। সরকার তাদের বেশ কিছু দাবি মেনেও নিয়ে পাঠ্যবই প্রণয়ন করে। হেফাজতের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর এনিয়ে সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে আল্লামা আহমদ শফীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ছবিটি আলোচনার ঝড় তুলেছে রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সর্বত্রই চলছে আলোচনা-সমালোচনা। সরকার হঠাৎ করেই হেফাজত ও কওমী আলেমদেরকে কেন কাছে টানছেন এনিয়েও চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে, কওমী মাদরাসার স্বীকৃতি তাদের প্রাপ্য ছিল। সরকার সেটাই করেছে। এখানে ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য নেই। তবে, বিশ্লেষকরা বলছেন, হেফাজত ও কওমী আলেমদের সঙ্গে সরকারের এ সম্পর্ক আগামী নির্বাচনে ভোটের জন্য। এদেশের ধর্মীয় সংগঠন ও ধর্মপ্রাণ মানুষ নির্বাচনে বরাবরই বিএনপি-জামায়াত জোটকে সমর্থন দিয়ে আসছে। বিএনপি-জামায়াতের ভোটের এ অংশে ভাগ বসাতেই সরকার নতুন কৌশল নিয়েছে। আবার কেউ কেউ বলছেন, কওমী মাদরাসার স্বীকৃতিতো বিএনপি-জামায়াতের আমলেই দেয়া। সরকার সেটা বাস্তবায়ন না করে নতুন করে আবার স্বীকৃতি দিল কেন? এর মাধ্যমে সরকার আসলে হেফাজত ও কওমী আলেমদেরকে কাছে টানতে চাচ্ছে।

অপরদিকে, গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হেফাজত নেতাদের এ বৈঠকের পর চরম বেকায়দায় পড়েছে সরকারের শরিক বাম সংগঠনগুলো। বিশেষ করে বাম মন্ত্রীরা। বাম সংগঠনগুলো প্রকাশ্যেই সরকারের ওপর নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করছে। হেফাজত ও কওমী আলেমদের দাবি দাওয়া মেনে নেয়ার ঘটনাকে নিজেদের জন্য ভবিষ্যত বিপদসংকেত হিসেবে দেখছেন বাম ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা। কারণ, এদেশের বামপন্থি সংগঠনগুলো অস্তিত্বহীন অবস্থায় রাজনীতির মাঠে কোনো রকমে টিকে আছে। টিকে থাকতে কখনো নিজেদের মধ্যে জোট করে আবার কোনো সময় বামপন্থিদের ঠিকানা হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগের ছায়ায় আশ্রয় নেয়। আওয়ামী লীগের নৌকায় পা দিয়ে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর প্রথমবারের মতো ক্ষমতার কাছে আসে তারা। তখন কৌশলগত কারণে আওয়ামী লীগও তাদেরকে নিজেদের ছায়ায় রেখেছে। এ সুযোগে বামপন্থিরা যে আওয়ামী লীগের ঘাড়ে যথেষ্ট শক্ত হয়ে বসেছে সেটাও বুঝতে পারছেন শেখ হাসিনা।

অন্যদিকে, দেশের রাজনীতিতে এখন প্রতিদিনই নতুন নতুন প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকারকেও নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করতে হচ্ছে। আওয়ামী লাগ ভাল করেই জানে যে, বামপন্থি দলগুলোর সারাদেশে কোনো অস্তিত্ব নেই। তাদের কোনো ভোটও নেই। তাই আগামী নির্বাচনে ভোটের বিবেচনায় সরকার হেফাজতে ইসলাম ও কওমী মাদরাসার আলেমদের সঙ্গে সম্পর্ক ভাল করার কৌশল নিয়েছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

সম্পর্কের উন্নয়ন

৫ মে’র ঘটনার পর সরকার হেফাজতের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে গেলেও গোপনে সংগঠনটির নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করতেন সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী। জানা গেছে, পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ সালাম মাঝেমধ্যে হেফাজতের আমিরের পরিচালনাধীন হাটহাজারী মাদ্রাসায় যেতেন। সরকারি দলের নেতা, মন্ত্রী ও বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের মাদ্রাসায় যাওয়া-আসার কথা হেফাজত নেতারা গণমাধ্যমের কাছে স্বীকারও করেছেন। পরে আওয়ামী লীগ, সরকার ও ছাত্রলীগকে হেফাজতের বন্ধু বলে আহমদ শফীর দেয়া বক্তৃতার পর এ বিশ্বাস আরও জোরালো হয়। সর্বশেষ ব্যক্তিগত জীবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ধর্ম পালনের বিষয়টি উল্লেখ করে আহমদ শফী বলেন, ‘তিনি আস্তিক, আমরাও আস্তিক। আমরা এবং তাঁদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। আমাদের আন্দোলন নাস্তিকদের বিরুদ্ধে।’

মামলায় অগ্রগতি নেই

হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে পুলিশ তিন বছর আগে অর্ধশতাধিক মামলা করলেও সরকারের সঙ্গে ধর্মভিত্তিক এই সংগঠনটির সম্পর্ক এখন ঘনিষ্ঠ। ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের ঘটনার পর পুলিশ একে একে মামলাগুলো দায়ের করে। উভয় পক্ষ থেকে জানা গেছে, সরকারের সঙ্গে একধরনের অলিখিত সমঝোতার ফলে হেফাজতের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে আছে। বিনিময়ে ১৩ দফা দাবি নিয়ে আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে হেফাজত। মামলা বিষয়ে সংগঠনটির মহাসচিব জুনাইদ বাবুনগরী গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদেরটা ঝুলে আছে কেন, এটা তো সরকারই জানে। কেন তারা ঝুলিয়ে রাখছে, সেটা আমরা জানি না।

৫ মে’র ঘটনা নিয়ে নীরব হেফাজত

৫ মের অভিযানে আড়াই থেকে তিন হাজার লোক ‘শহীদ’ হয়েছে বলে সে সময় হেফাজতের পক্ষ থেকে দাবি করা হলেও এখন নেতারা এ বিষয়ে নিশ্চুপ। গত তিন বছরেও ‘শহীদদের’ নামের তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। এই দাবির পক্ষে কোনো তথ্য-প্রমাণও দিতে পারেনি তারা। এখন হেফাজত নেতারা বলছেন, ৫ তারিখে যাঁরা আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়েছেন, তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। তাঁদের রক্তের বিনিময়ে এ দেশে শান্তি, হক ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা হবে। জুনাইদ বাবুনগরী গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা এখন শহীদদের তালিকা প্রকাশ করব না। সময় এলে করব। সে সময়টা কবে পাল্টা প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সময়টা আসুক, দেখবেন।

হেফাজতের মাহফিলে অতিথি আওয়ামী লীগ নেতা

আল্লামা শফীর এসব বক্তব্যের পর দিন যত যাচ্ছিল আওয়ামী লীগ হেফাজের মধ্যে সম্পর্ক ততই গভীর হচ্ছিল। কক্সবাজারের চকরিয়ার বানিয়াছাড়া স্টেশন বহুমুখী সমিতির মাঠে তাফসীরুল কোরআন মাহফিলের আয়োজন করা হয়। মাহফিলের আয়োজক লামা উপজেলার হেফাজতের সামাজিক সংগঠন হিসেবে পরিচিত পূর্ব বানিয়াছাড়া ফাইতং ইসলামী যুব ঐক্য পরিষদ। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন লামা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ মো. ইসমাঈল। আর প্রধান মেহমান করা হয় হেফাজতে ইসলামী বাংলাদেশের সাংগঠনিক সম্পাদক আল্লামা আজিজুল হক ইসলামাবাদীকে। মাহফিলের নিয়মিত বিরতিতে সভাপতিত্ব করেন লামা উপজেলার ৭ নম্বর ফাইতং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এবং সাবেক ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি জালাল উদ্দিন কোম্পানি এবং কক্সবাজার জেলা হেফাজত নেতা হাফেজ মাওলানা ছোহাইব নোমানী। এর আগে আনোয়ারা উপজেলায় দেওতলা ইসলামী তরুণ সংঘ নামের একটি সংগঠন ইসলামী মহাসম্মেলন আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব করেন ৯ নম্বর পরৈকোড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মামুনুর রশিদ চৌধুরী (আশরাফ)। আলোচক করা হয়েছিল হেফাজতের সাংগঠনিক সম্পাদক আল্লামা আজিজুল হক ইসলামাবাদীকে। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ মো. ইসমাঈল বলেন, ‘জামাতের সাথে আমাদের রাজনৈতিক দূরত্ব আছে, হেফাজতের সাথে আমাদের রাজনৈতিক দূরত্ব নেই। তারা অতীতের ভুল বুঝতে পেরেছে।’

আওয়ামী লীগের সভায় হেফাজতের মিছিল

আওয়ামী লীগের এই সম্পর্ক শুধু সামাজিক সংগঠনের মাহফিলেই সীমাবদ্ধ ছিল না। গড়িয়েছে রাজপথ পর্যন্ত। গত বছরের ২৩ আগস্ট দেশব্যাপী জঙ্গিবাদের উত্থান ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা তৈরি করতে এক সমাবেশের আয়োজন করে চট্টগ্রাম মহানগরীর ১৪ নম্বর লালখান বাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ। আর সেখানেই অর্ধশতাধিক লোকের মিছিল নিয়ে হাজির হন লালখান বাজার জামেয়াতুল উলুম আল ইসলামিয়া মাদ্রাসার হেফাজত নেতাকর্মীরা। হেফাজতের মহাসচিব আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরীর নির্দেশেই সংগঠনের পক্ষ থেকে নেতাকর্মীরা সমাবেশে যোগ দেন।

পাঠ্যবই সংশোধন

এরপর ২০১৬ সালে পাঠ্যবইয়ে ১৭টি বিষয় সংযোজন ও ১২টি বিষয় বাতিলের সুনির্দিষ্ট দাবিতে আন্দোলন করেছিল সংগঠনটি। তারা সরকারের কাছে এসব দাবিতে স্মারকলিপিও দিয়েছিলেন। পরে ২০১৭ সালে নতুন পাঠ্যবই প্রকাশের পর দেখা গেছে এসব সংযোজন-বিয়োজন হয়েছে। এজন্য হেফাজতের পক্ষ থেকে সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে ধন্যবাদও জানানো হয়েছে।

হেফাজতের সঙ্গে আপস

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম গণমাধ্যমকে বলেছেন, রাজনীতিতে বলুন, সরকার পরিচালনায় বলুন সবসময়ই ছোটখাটো অনেক আপোষ করতে হয় বৃহত্তর স্বার্থে। যেমন, এর আগে নারী নীতি নিয়ে কথা হয়েছিল তখন আমি নিজেই আলেম ওলামাদের সঙ্গে বসেছি, তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছি। তারপর শিক্ষানীতি নিয়ে যখন কথা হয়েছে তখন আমাদের সরকারের থেকে ক্যাবিনেটেই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে যে, এই নীতিমালাগুলোতে এমন কিছুই থাকবে না যেটি শরিয়া পরিপন্থি, কোরান হাদিসের পরিপন্থি। আসলে থাকেও নি। তার ফলে বিষয়টিকে বলতে পারি ডিফিউজ করা হয়ে গেছে, না হলে এটা একটা খারাপ রূপ ধারণ করতে পারতো। ঐ সুযোগটি তো আমরা দেবো না।

কওমীর স্বীকৃতি, মানে গোঁজামিল

কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিসের সনদকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির সমমান দিয়ে গত বৃহস্পতিবার প্রজ্ঞাপন জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর মাধ্যমে প্রায় সোয়া দুইশ’ বছর পর সরকারের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেল কওমী শিক্ষা। কওমী মাদ্রাসাগুলোর সমন্বয়ে দেশে মোট ৫টি পৃথক শিক্ষা বোর্ড থাকলেও সেগুলোর কোনো সরকারি স্বীকৃতি ছিল না। সরকারি হিসেবে ২০১৫ সালে কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৯০২টি। শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ। এ হিসেবের বাইরেও কয়েক হাজার মাদ্রাসা রয়েছে। কওমি সংশ্লিষ্টদের দাবি, মাদ্রাসার সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০ লাখেরও বেশি। এদিকে এই সমমান দেওয়ার বিষয়ে নানা আইনগত জটিলতা তৈরি হয়েছে। কওমি মাদ্রাসার সঙ্গে সম্পর্কিত বিশিষ্ট আলেমরা সনদের ‘সরকারি স্বীকৃতি’ চাইলেও তারা এ বিষয়ে সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ চান না। নিজ নিজ কওমি বোর্ডের অধীনে নিজেরাই তারা এ সনদ ইস্যু করতে চান। অথচ কওমী মাদ্রাসা বোর্ডগুলো সরকার স্বীকৃত কোনো বোর্ড নয়। তাই তাদের ইস্যু করা সনদের আইনগত কোনো ভিত্তি এখনও নেই। আবার এসব বোর্ডের সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হলেও দেশের প্রচলিত আইনে মাস্টার্সের সমমান সনদ কোনো শিক্ষা বোর্ড ইস্যু করতে পারে না। কেবলমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ই তা পারে। অথচ এই সনদ কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে গিয়ে নিতে রাজি নন কওমী মাদ্রাসার আলেমরা। দাওরায়ে হাদিসকে আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজের মাস্টার্সের সমমান দেওয়া হলেও প্রচলিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সিলেবাস ও কারিকুলামের সঙ্গে তা মেলে না। এ রকম নানা প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি।

অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে, মাদ্রাসার শিশু শ্রেণি থেকে স্নাতক পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থা আগের মতোই থাকবে। এগুলোর সরকারি স্বীকৃতির প্রয়োজন নেই, বলা হচ্ছে। মাদ্রাসায় বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞানের মতো সাধারণ বিষয় পড়ানো হবে না। মাদ্রাসার পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, পরীক্ষা গ্রহণ ও ফল প্রকাশের দায়িত্ব বিদ্যমান বোর্ডগুলোই করবে। মাদ্রাসা পরিচালনায় সরকারের ভূমিকা থাকতে পারবে না। শেষ পর্যন্ত এসব দাবি মেনেই স্বীকৃতি দিয়েছে সরকার। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের লাভ হবে না বলে মনে করেন কওমীর সনদের স্বীকৃতির দাবিতে দীর্ঘ দিন আন্দোলন করা ‘স্বীকৃতি বাস্তবায়ন কমিটি’র সদস্য সচিব মাওলানা মুহম্মদ তামনিম। তিনি বলেন, শুধু স্বীকৃতির ঘোষণা এসেছে। কীভাবে তা বাস্তবায়ন হবে, তা এখনও পরিষ্কার নয়। শুধু দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান দেওয়ার ঘোষণা এসেছে। এখন খুব স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসবে- তাহলে অনার্স, এসএইচসি, এসএসসি, জেএসসি, পিইসির সমমান হবে কোন পরীক্ষাগুলো। এসএসসি, এসএইচসি পাস না করে কেউ মাস্টার্স পাস করতে পারে না। কিন্তু বিভিন্ন দলের দাবি মানতে গিয়ে সরাসরি মাস্টার্সের সমমান দেওয়া হয়েছে। এতে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের কোনো লাভ হবে না। তারা এ সনদ দিয়ে বিসিএস বা অন্যান্য সরকারি চাকরি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে কি-না তাও এখনও পরিষ্কার নয়। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, নির্ধারিত পূর্ণাঙ্গ কারিকুলাম, সিলেবাস ও কোর্সের সমাপ্তির মধ্য দিয়েই একটি ডিগ্রি অর্জন করা সম্ভব। অথচ এক্ষেত্রে নানা প্রশ্নের জবাব এখনও মিলছে না।

বিএনপির আমলেই স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল

প্রধানমন্ত্রীর দেয়া এ স্বীকৃতি নিয়েও আরেক ধুম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, বিগত বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলেই কওমী মাদরাসার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিসকে আরবী সাহিত্য ও ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ের মাস্টার্সের মান প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। জামায়াতের পক্ষ থেকে একাধিকবার সংসদে কওমী মাদ্রাসার স্বীকৃতির পক্ষে দাবি তোলা হয়। তৎকালীন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ কওমী মাদরাসার স্বীকৃতির বিষয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং শিক্ষামন্ত্রী ড. ওসমান ফারুককে অনুরোধ করেন। ইসলামী ঐক্যজোটের তৎকালীন চেয়ারম্যান শায়খুল হাদীস আল্লামা আজীজুল হক ও মুফতি ফজলুল হক আমিনীরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এরপর ২০০৬ সালে কওমী মাদরাসাকে স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নেয়। ওই বছরের ২৯ আগস্ট এবিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপনও জারি করে সরকার। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, শিক্ষামন্ত্রণালয়ের ২৯ আগস্ট ২০০৬ তারিখের শখা:১৬/বিবিধ-১১(৯)/২০০৩(অংশ)-৮৮৭ সংখ্যক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কেবলমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আরবী সাহিত্য এবং ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ে শিক্ষকতা, কাজীর দায়িত্ব/মসজিদে ইমামতির সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে-দেশের কওমী মাদরাসার দাওরা ডিগ্রী এমএ (ইসলামিক স্টাডিজ/আরবী সাহিত্য) ডিগ্রীর সমমানের হিসেবে বিবেচিত হবে। পরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল থাকায় জোট সরকার এটা আর বাস্তবায়ন করে যেতে পারেনি। এখন নতুন করে কওমীকে মাদরাসাকে স্বীকৃতি প্রদানের ঘোষণার পর এনিয়ে সারাদেশে সমালোচনার ঝড় বইছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও চলছে ব্যাপক সমালোচনা। রাজনীতিক বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদরা বলছেন, বর্তমান সরকারের দায়িত্ব হল আগের সরকারের দেয়া স্বীকৃতিকে বাস্তবায়ন করা। যে বিষয়ে একবার স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে এটাকে আবার নতুন করে স্বীকৃতি দেয়ার কিছু নেই। তাদের মতে, এ স্বীকৃতির মাধ্যমে একদিকে সরকার কৃতিত্ব নিতে চায় অপরদিকে হেফাজত ও কওমী আলেমদেরকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে।

টার্গেট ভোটব্যাংক

এদেশে নির্বাচন আসলেই ধর্মীয় বিষয়গুলো মাঝে এসে দাঁড়ায়। দেশের ধর্মীয় সংগঠন ও ধর্মপ্রাণ মানুষ বরাবরই নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটকে সমর্থন দিয়ে আসছে। এনিয়ে প্রতিটি নির্বাচনেই অস্বস্তিতে পড়তে হয় আওয়ামী লীগকে। তাই এবার প্রথম থেকেই সেই রাস্তাটা পরিষ্কার করে রাখতে চাইছে আওয়ামী লীগ। সে লক্ষ্যে তারা এখন থেকেই দেশের আলেম ওলামাদেরকে কাছে টানতে শুরু করেছে। জানা গেছে, আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে আর হেফাজত ও কওমী মাদরাসার আলেম ওলামাদের সঙ্গে বিরোধে যাবে না আওয়ামী লীগ। কওমীর সনদ, উচ্চ আদালত থেকে ভাস্কর্য অপসারণে, হেফাজতকে খুশি করে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া বক্তব্য এবং পয়লা বৈশাখে দলের র‌্যালি বাতিলের পেছনে এসব অন্যতম কারণ। বর্তমানে কওমী মাদরাসায় ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ১৪ লাখ। রয়েছে এসব ছাত্র-ছাত্রীর পরিবার। হিসাব করলে এখানে বড় একটি ভোটব্যাংক দাঁড়ায়। সে জন্য ভোটব্যাংকের হিসাব মাথায় নিয়ে কওমী মাদরাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামকে কাছে রাখার কৌশল নেয়া হয়েছে। আর কোনোভাবেই এই ভোটব্যাংক হাতছাড়া করতে রাজি নয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। পাশাপাশি এসব শিক্ষার্থীকে মূল ধারায় নিয়ে আসার চেষ্টাও সনদের স্বীকৃতির পেছনে বড় কারণ।

আ.লীগে স্বস্তি-অস্বস্তি

হেফাজতের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক নিয়ে আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যে কিছু না বললে ভেতরে ভেতরে অনেকেই অস্বস্তিতে আছেন। হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সখ্যতা নিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, কওমী মাদরাসার স্বীকৃতির পরে আল্লামা শফী হুজুর এক জনসভায় জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান নেওয়াটা লাভ নয় কি? ওবায়দুল কাদের লাভ দেখলেও দলের মাঠপর্যায়ের নেতারা মনে করছেন, হেফাজতবিষয়ক কৌশলে লাভের চেয়ে লোকসানের পাল্লাও কম ভারী নয়। কারণ, যত দাবিই মানা হোক না কেন, এই গোষ্ঠীর ভোট আওয়ামী লীগ পাবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। উল্টো কালো দাগ পড়েছে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। এ ছাড়া আহমদ শফীসহ হেফাজত নেতাদের সম্পর্কে ব্যাপক নেতিবাচক বক্তব্য দেওয়ার পর এভাবে কাছে টেনে নেওয়াটাও বিব্রতকর। দলের কেউ কেউ মনে করছেন, হেফাজতের কারণে প্রগতিশীল নাগরিকদের একটা অংশের সঙ্গে আওয়ামী লীগের দূরত্ব তৈরি হতে পারে, যাঁরা আওয়ামী লীগের দুর্দিনে নানাভাবে পাশে থাকেন।

হেফাজত আ.লীগকে ভোট দেবে কী

আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে হেফাজতের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়লেও তারা আওয়ামী লীগকে ভোট দেবে না বলে মনে করছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. জাফর ইকবাল। জাফর ইকবাল গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা টের পেতে শুরু করেছি নির্বাচন আসছে। যেভাবে টের পেয়েছি সেটি যে আমরা খুব পছন্দ করেছি তা নয়। শুরু হয়েছে পাঠ্যবইকে হেফাজতিকরণ দিয়ে। এ দেশের সরকার কওমী মাদরাসার পাঠ্যক্রমে হাত দিতে পারে না, কিন্তু হেফাজত এ দেশের মূলধারার পাঠ্যক্রমে শুধু যে হাত দিতে পারে তা নয়, সেটি তারা পরিবর্তন করে ফেলতে পারে। আমার এখনও বিশ্বাস হয় না হেফাজতে ইসলামকে খুশি করার জন্য আমাদের পাঠ্যক্রমকে পরিবর্তন করা হয়েছে। পাঠ্যবই দিয়ে শুরু হয়েছে, কোথায় শেষ হবে আমরা জানি না। হেফাজতের কাছে নতজানু হয়ে এই আত্মসমর্পণ যে একধরনের ভোটের রাজনীতি, সেটি বোঝার জন্য কাউকে রকেট সায়েন্টিস্ট হতে হয় না। কিন্তু আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে দেখে এসেছি, ভোটের এই রাজনীতি কখনও কাজ করেনি, সাম্প্রদায়িক দলগুলো কখনোই আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়নি, কখনও দেবে না।

ক্ষুব্ধ বামপন্থী সংগঠনগুলো

হেফাজত ও কওমী মাদরাসার আলেমদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছে বামপন্থি সংগঠনগুলো। তারা এখন প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করছে। তাদের মতে, আগামী সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হেফাজতে ইসলামের সাথে কৌশলগত ঐক্যকে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ এবং বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মূলে এক ধরনের কুঠারাঘাত। এ কারণে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী বুদ্ধিজীবী, ছাত্র-জনতা, রাজনৈতিকভাবে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়বে। সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক সংগ্রাম সার্বিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এজন্য জাতিকে কঠিন খেসারত দিতে হবে। তারা বলেন, হেফাজত ইসলামের রাজনীতি মূলতঃ সাম্প্রদায়িক। পবিত্র ইসলাম ধর্মকে অপব্যাখ্যা করে আমাদের দেশের সাম্প্রদায়িক দক্ষিণপন্থী রাজনীতির আদর্শকে মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে এরা। সরকার জঙ্গীগোষ্ঠির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা বললেও জঙ্গীবাদের রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তি ভূমি হচ্ছে হেফাজতে ইসলামের রাজনৈতিক দর্শন। ফলে যে রাজনৈতিক মতাদর্শিক বুননে জঙ্গীবাদের উৎপত্তি তার সাথে আপোষ করে জঙ্গীদের সমূলে উৎখাত করা সম্ভব নয়। বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন প্রথম দিকে নেতিবাচক কড়া বক্তব্য দিলেও এখন এবিষয়ে আর মুখ খুলতে দেখা যাচ্ছে না। কৌশলগত কারণে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুও চুপচাপ আছেন।  সূত্র: শীর্ষকাগজ

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন