আগামী সংসদ নির্বাচন: প্রার্থী বাছাইয়ে চমক থাকবে বিএনপিতে

সময় বাংলা ডেস্ক: আগামীতে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনই এখন বিএনপির প্রধান চ্যালেঞ্জ। একাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নানামুখী কার্যক্রম চলছে দলটিতে। সম্প্রতি একাধিক ইফতার মাহফিলে বেগম খালেদা জিয়ার বক্তব্যে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়ার ইঙ্গিতও পরিলক্ষিত হয়েছে। ৫ জুন রাজনীতিবিদদের সম্মানে দেয়া বেগম জিয়ার ইফতার মাহফিলে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হয়ে ওঠে। আগামী নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ইসির উদ্দেশে তিনি বলেছেন, এ সরকার আপনাদের কাছে যা কিছু আবদার করবে, আপনারা তা বাস্তবায়ন করবেন না। আপনারা জনগণের মতামত নেবেন। সব রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা করে যে মতামত পাবেন, তার ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন পরিচালনা করবেন।

সর্বশেষ গত মঙ্গলবার এলডিপির ইফতারে আগামী নির্বাচনের দিকে ইঙ্গিত দিয়ে বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, ইনশাল্লাহ আমরা বিশ্বাস করি ২০১৮ সাল দেশের জনগণের বছর হবে। একই সাথে দেশ থেকে সব অত্যাচার ও অত্যাচারী বিদায় নেবে। এর আগে গত ৫ জুন সোমবার তার উদ্যোগে দেয়া রাজনীতিবিদদের সম্মানে দেয়া ইফতারে জোটের বাইরে থাকা অন্যান্য দলের নেতাদের সাথে কুশল বিনিময়ের সময় দেশের সাম্প্রতিক বিভিন্ন ইস্যুতে কথা বলেছেন তিনি। ওই সব রাজনৈতিক দলের নেতারাও রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানে বেগম জিয়াকে সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন। এ সময় বেগম জিয়া তাদের আশ্বস্ত করেছেন সঙ্কট নিরসনে সব ধরনের পথ খোলা রেখেছেন তিনি। অর্থাৎ বিএনপি আগামী নির্বাচনের ব্যাপারে মনোযোগী। তবে অবশ্যই তা নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের অধীনে হতে হবে বলে দলটির নেতারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন।

দলটির নেতারা বলছেন, আন্দোলন করেই নিরপে সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায় করতে হবে। এর বিকল্প কোনো পথ নেই। খালেদা জিয়া ছাড়া দেশে কোনো নির্বাচন হবে না। নির্বাচনের আগে বিশ দলীয় জোটকে আরো সক্রিয় করার পাশাপাশি অন্যান্য রাজনৈতিক জোট ও দলগুলোর সাথেও একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি আলোচনা করবে।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী গতকাল বলেন, ক্ষমতাসীনরা ভরাডুবির ভয়ে নানা প্রহসন আর নকশা করে যাচ্ছেন। তবে আগামী দিনে আওয়ামী ঝুড়িতে অবৈধ ভোট ভরার জন্য কোনো নীলনকশা বা অভিনব ইঞ্জিনিয়ারিং বাস্তবায়িত হতে দেবে না জনগণ। সন্ত্রাসের নির্মাণ ও বিপণন করে আগামী জাতীয় নির্বাচনে ভোট ডাকাতির কোনো সুযোগ পাবে না আওয়ামী লীগ। নিরপে সরকারের অধীনেই আগামী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে।

জানা গেছে, ঈদুল ফিতরের পর নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করবে বিএনপি। এ ইস্যুতে সরকারের সাথে সমঝোতা না হলে দাবি আদায়ে সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে আন্দোলন বিবেচনায় থাকবে। দলটি আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে দ্রুত দল গোছানোর কাজও শেষ করছে। দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা মনে করছেন বিএনপি একাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। এ প্রত্যাশায় নির্বাচন সামনে রেখে এখন থেকেই দলীয় মনোনয়ন পেতে সার্বিক প্রস্তুতি নিচ্ছেন নেতারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আগামী নির্বাচন ঘিরে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম আংশিকভাবে চূড়ান্ত করছে বিএনপি। এ ক্ষেত্রে ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নামের তালিকা ধরেই আগামী নির্বাচনের প্রার্থী বাছাইয়ের কার্যক্রম চলছে। এসব তালিকা থেকেই পরিবর্তন, পরিবর্ধন এবং পরিমার্জন করা হবে। যারা বিগত ওয়ান ইলেভেনের সরকারের আমলে নানা কারণে নির্বাচন করতে পারেননি, কিন্তু যোগ্য ছিলেন এমন ব্যক্তিদেরও মনোনয়ন দেয়া হতে পারে। আগামী নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ব্যাপারে স্থায়ী কমিটির সদস্য, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সর্বোপরি প্রার্থী বাছাইয়ে বিএনপির পার্লামেন্টারি বোর্ড মনোনয়নের ব্যাপারে সুপারিশ করবে। তবে চূড়ান্তভাবে প্রার্থী মনোনয়ন দিবেন বেগম খালেদা জিয়া।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপিতে আগামী নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে চমক থাকবে। সেই চমক হচ্ছেÑ জিয়া পরিবার থেকে একাধিক প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। পাশাপাশি অন্তত ২০ ভাগ তরুণ ও সাবেক ছাত্রনেতারা মনোনয়ন পাবেন। ঈদুল ফিতরের পর বেগম জিয়ার চোখের চিকিৎসা করাতে যুক্তরাজ্য যাওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে চিকিৎসারত বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও তার বড় ছেলে তারেক রহমানের সাথে আগামী নির্বাচন, আন্দোলন, সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়েও কথা বলবেন তিনি।

দলের একাধিক নেতার সাথে কথা বলে জানা যায়, একাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে অপ্রকাশ্যেই চলছে প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ। গুলশান কার্যালয়ে বেগম খালেদা জিয়া নিজেই এ বিষয়ে কাজ করছেন। তিন স্তরে প্রার্থী বাছাই করে প্রস্তুত রাখা হবে। সম্ভাব্য কোনো প্রার্থীর সাজা হলে বা অন্য কোনো কারণে নির্বাচনে অযোগ্য হলে দ্বিতীয় স্তর থেকে কাউকে মনোনয়ন দেয়া হবে। তিনিও কোনো কারণে বাদ পড়লে বিকল্প হিসেবে তৃতীয় জনকে বেছে নেয়া হবে। সিনিয়র নেতাদের পাশাপাশি ছাত্রদলের অনেক সাবেক নেতাও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তারা বিভিন্নভাবে প্রচার চালাচ্ছেন। ছাত্রদলের সাবেক নেতারা যোগ্য ও নিজ এলাকায় জনপ্রিয় হলে মনোনয়নের ক্ষেত্রে তাদের বিষয়টি বিবেচনা করবে বিএনপির হাইকমান্ড।

এ দিকে ইতিবাচক সাড়া পেয়ে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেতে মাঠ সাজাচ্ছেন বহু নেতা। তাদের মধ্যে অনেকেই তরুণ এবং সাবেক ছাত্রনেতাও রয়েছেন। আগামীতে পাবনা সদর আসনে নির্বাচন করবেন বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস। সেখানে তিনি একক প্রার্থী বলে জানা গেছে। মাদারীপুর-১ (শিবচর) থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছেন শিবচর উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ইয়াজ্জেম হোসেন রোমান, টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতি) থেকে ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও টাঙ্গাইল চেম্বারস অব কমার্সের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বেনজীর আহমেদ টিটো, বগুড়া সদর আসন থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছেন জেলা বিএনপি সভাপতি ও নির্বাহী কমিটির সদস্য ভিপি সাইফুল ইসলাম। তবে সেখানে বেগম খালেদা জিয়া প্রার্থী না হলে ভিপি সাইফুলের মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ইয়াজ্জেম হোসেন রোমান জানান, তিনি এলাকার মানুষের সাথে যোগাযোগ রাখছেন। বিভিন্নভাবে দলীয় কার্যক্রম চালাচ্ছেন। গতকালও ইফতার মাহফিল করার কারণে পুলিশ তার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছে। এলাকাবাসী যোগ্য, তরুণ সৎ মানুষকে এমপি হিসেবে চায় বলে জানান তিনি।

নেত্রকোনা-১ থেকে কেন্দুয়া উপজেলা চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন ভুঁইয়া দুলাল, সিলেট-৬ থেকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এনামুল হক চৌধুরী, রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) থেকে সাবেক ছাত্রনেতা আবু বকর সিদ্দিক, নেত্রকোনা-৫ থেকে শহিদুল্লাহ ইমরান, মুন্সীগঞ্জ-২ থেকে বিএনপির কোষাধ্যক্ষ মিজানুর রহমান সিনহা এবং সহসাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ, ফেনী-৩ থেকে নির্বাহী কমিটির সাবেক সহদফতর সম্পাদক বর্তমানে সদস্য আবদুল লতিফ জনি, ঢাকা-১০ (লালবাগ-ধানমন্ডি) থেকে মহানগর দণি বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক শেখ রবিউল আলম রবি, জামালপুর-৫ থেকে নিলোফার চৌধুরী মনি, চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) থেকে বিএনপির সহতথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সাংবাদিক কাদের গণি চৌধুরী, গাইবান্ধা-৩ (সাদুল্লাপুর-পলাশবাড়ী) থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেতা ড. মিজানুর রহমান মাসুম, চাঁদপুর-৫ থেকে ছাত্রদলের সাবেক দফতর সম্পাদক বিল্লাল হোসেন তারেক, দিনাজপুর-১ (বীরগঞ্জ-কাহারোল) থেকে যুবদলের সেক্রেটারি ও ব্যবসায়ী মেহেদী হাসান সুমন নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন