আজ জাতীয় কবির জন্মদিন: কুমিল্লায় ধ্বংসের মুখে ৯ স্মৃতিচিহ্ন

বারী উদ্দিন আহমেদ বাবর, সময় বাংলা, কুমিল্লা: আজ অসাম্প্রদায়িক বাঙালির প্রাণের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১১৮তম জন্মবার্ষিকী। বাংলাদেশের জাতীয় কবি এবং বাংলাভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার অতুলনীয় প্রতিভার স্পর্শে সমৃদ্ধ করেছেন কবিতা ও সংগীতের ভুবনকে। বাঙালির স্বাধীন রাজনৈতিক চেতনা গঠনে নজরুলের অবদান অসামান্য। কবিতা, গান ও প্রবন্ধের মাধ্যমে তিনি মানবিক দর্শনে ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বাঙালির মনোরাজ্যকে বিকশিত করতে অনেক অবদান রেখেছেন।

নজরুল ইসলামের জন্ম ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ (১৮৯৯ সালে)। অবিভক্ত ভারতে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামের কাজী পরিবারে। নজরুলের পূর্বপুরুষরা সিপাহি বিদ্রোহে অংশ নেওয়ায় ইংরেজদের বিরাগভাজন হন। এই বিদ্রোহের বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল নজরুলের ভেতরে। কাজী ফকির আহমেদ ও জাহেদা খাতুনের ষষ্ঠ সন্তান ছিলেন নজরুল।কুমিল্লায় ধ্বংসের মুখে নজরুলের ৯ স্মৃতিচিহ্ন:
কিন্তু কবি নজরুলের স্মৃতিবাহী কুমিল্লা শহরের বিভিন্ন পথে স্থাপিত ১২ টি ফলকের মধ্যে ৯টিরই করুণ দশা। এদের কয়েকটা কবে যে তুলে ফেলা দেয়া হয়েছে সে খবরও কেউ রাখেনি। জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে মুরাদনগরের দৌলতপুরে নজরুলের বাসরঘরসহ দৌলতপুরের প্রবেশদ্বারের স্মৃতিফলকগুলো।
ধূমকেতুর মত উদ্ভাসিত কবি নজরুল ১৯২১ সালের ৩ এপ্রিল থেকে ১৯২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পাচঁবারে ১১ মাস কাটিয়েছিলেন কুমিল্লায়। নজরুলের প্রেম,বিয়ে-বিচ্ছেদ, গ্রেফতার, সমাবেশ এবং কাব্য ও সংস্কৃতিচর্চসহ বহু ঘটনার নীরব সাক্ষী হয়ে আছে কুমিল্লার বিভিন্ন জনপদে স্থাপিত স্মৃতিফলকগুলো।
১৯২২ সালের ২৩ নভেম্বর শহরের ঝাউতলা সড়কের শেষ প্রান্তে রাস্তার দক্ষিণ পাশে ‘আনন্দময়ীর আগমন’ কবিতার জন্য গ্রেফতার স্থানে রয়েছে একটি স্মৃতিফলক। স্থানীয় দোকানীর পসরায় সেটিও চোখের আড়াল হয়েছে।

কুমিল্লায় কান্দিরপাড়ে ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বাড়ি। কুমিল্লায় আসলে সেখানে উঠতেন কবি। সে বাড়ির পুকুর ভরাট করে নির্মিত হয়েছে অট্টালিকা। সেই বাড়ির স্মৃতিফলকটিও এখন আর নেই।

১৯২১ সালের ২১ নভেম্বর ব্রিটিশবিরোধী মিছিলে কবির অংশ নেয়ার স্থানে স্মৃতিবিজড়িত ফলকটিও এখন আর নেই।

কান্দির পাড়ে কংগ্রেসনেতা বসন্ত কুমার মজুমদারের বাড়ি। এখানে নজরুল ফলক ছিল। এ ফলকটিও ফরিদা বিদ্যায়তনের সামনে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
শহরের বজ্রপুরে ইউসুফ হাই স্কুলের নিকটের মিষ্টি দোকানের স্মৃতি রক্ষার্থে কোনো ফলকও নেই।

দারোগাবাড়ির সঙ্গীত-জলসায় বেশ ক’বার অংশ নিয়েছেন কবি। সেই বাড়ির সামনে নজরুল স্মৃতিরক্ষা পরিষদ ১৯৮৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর একটি ফলক স্থাপন করে। নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত এই স্থানের কোনো খবর কেউ নিচ্ছে না।

নগরীর দ্বিতীয় মুরাদপুরে শচীন দেব বর্মনের সঙ্গে বসে সঙ্গীতচর্চা করেছেন কবি নজরুল। সেটি রক্ষাবেক্ষনে সাবেক এক জেলা প্রশাসক বাড়িটি সংস্কারসহ সাংস্কৃতিককেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

নানুয়ার দিঘিরপাড়ের সুলতান মাহমুদ মজুমদারের বাড়ি, নবাববাড়িতে নজরুলের স্মৃতিফলকগুলোও অযতেœ,অবহেলায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে।
মুরাদনগরে নজরুলের স্মৃতিচিহ্নঃ

বিয়ের রাতেই নজরুল অজ্ঞাত কারণে দৌলতপুর ছেড়ে চলে গেলেও রেখে গেছেন অনেক স্মৃতিচিহ্ন। সেই সব স্মৃতিময় গাছ, ঘাট, বাসরঘর, খাট প্রভৃতির সৌন্দর্য মলিন হতে বসেছে। বাসর ঘরের খাটে এখন মানুষ ঘুমায়,সেই বালিশ,কাঁথা ব্যবহার হচ্ছে। বাসর ঘরটিও আগের অবস্থায় নেই, পুরোটা প্রায় বিলীনের পথে। যে আম গাছের নিচে বসে কবি বাঁশি বাজাতেন সেটি মরে গেছে। আলী আকবর খাঁ মেমোরিয়াল ভবনটিও ধ্বংসের শেষ প্রান্তে। এটির সংস্কার ও সংরক্ষণ অতি জরুরি।

এদিকে মুরাদনগরের দৌলতপুরের প্রবেশপথে নজরুল তোরণের দুই পাশে স্থাপিত নজরুলের কবিতা গান সংবলিত লেখা কয়েকটি ফলক ভেঙ্গে গেছে।
এ বিষয়ে কুমিল্লা কবি নজরুল পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অশোক বড়ুয়া বলেন, গত ২ বছর পূর্বে নজরুলের এসব স্মৃতিফলক রক্ষা ও সংস্কার করার জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রনালয়ের সচিব বরাবরে চিঠি দিয়েছিলাম। মাত্র ৩টি স্মৃতিফলক সংস্কার করা হলেও বাকীগুলো এখনো অবহেলিত রয়েছে। সেগুলো খুব দ্রুত সংস্কারের প্রয়োজন বলে জানান তিনি।

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন