আমি বাংলাদেশী নই : টিউলিপ (ভিডিও)

সময় বাংলা ডেস্ক: ইরানে কারাগারে আটককৃত নাজানিন জঘারি-রাটক্লিফ এর মুক্ত করার আন্দোলনে ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকী অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন। অথচ বাংলাদেশে তার খালা শেখ হাসিনার অনুগত বাহিনী অবৈধভাবে অপহরণ করেছে ব্যারিস্টার আরমানসহ শত শত ব্যক্তিকে। নাজানিন জাঘারিকে মুক্ত করতে কন্ঠ উচ্চকিত করলেও রহস্যজনকভাবে বাংলাদেশের গুম-খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার মানুষদের জন্য এ পর্যন্ত কোন কথাই বলেননি লন্ডনে আওয়ামী লীগের মুখপাত্র টিউলিপ। মানবাধিকার নিয়ে এ দ্বিমুখী আচরণের ব্যাপারে চ্যানেল ফোরের সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করলে প্রথম এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন টিউলিপ। কিন্তু শেষ রক্ষা না হওয়ায় সাংবাদিকদের সাথে বিরূপ আচরণ করতে শুরু করেন তিনি। এক পর্যােয়ে টিউলিপ সিদ্দিক জানান ‘আমি বাংলাদেশী নই।’ এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় শুরু হয়।

সংবাদ ২৪/৭ এর পাঠকদের জন্য চ্যানেল ফোরের সেই আলোচিত প্রতিবেদনটি তুলে ধরা হলো।

আমরা এসেছি উত্তর লন্ডনের একটি এলাকায় যেখানে সমবেত জনতা নাজানিন জাঘারি রেক্টলিফের মুক্তির জন্য আন্দোলন করছে। নাজানিন বর্তমানে ইরানের একটি কারাগারে আটক আছেন। এখানে এসে আমরা স্থানীয় এমপি টিউলিপ সিদ্দিকীকে খুবই সক্রিয় অবস্থায় দেখতে পেলাম। এই আন্দোলনে তার প্রোফাইল এবং জনপ্রিয়তা ক্রমশই বাড়ছে।

টিউলিপ: আমরা চাই আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নাজানিনকে মুক্ত করার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিবেন। কেননা এটা নাজানিনের অধিকার।
সাংবাদিক: আপনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভুমিকা নিয়ে কি বলবেন?
টিউলিপ: এই ব্যপারে বরিস জনসন শুরুতে যা বলেছিলেন তা ছিল বিরাট এক ভুল। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি তার বক্তব্যকে সংশোধন করেছেন। জাতির কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন।

এটা সত্য যে নাজানিনকে মুক্ত করার জন্য যে আন্দোলনটি এখন চলছে সেখানে টিউলিপ সিদ্দিকী খুবই গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা পালন করছেন। কিন্তু অনেকেই বলছেন যে, টিউলিপ নাজানিনকে মুক্ত করার জন্য যেই সোচ্চার ভুমিকা রাখলেন সেটা তিনি বাংলাদেশের এরকমই আরেকজন ব্যক্তির জন্যেও রাখতে পারতেন। একটি ফোন কল দিয়েও তিনি একজন মানুষকে মুক্ত করতে অনেক বেশী ভুমিকা পালন করতে পারতেন। যিনি বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের নির্মম নিপীড়নের স্বীকার হয়েছেন।

আহমাদ বিন কাসেম বাংলাদেশের একজন আইনজীবি, একজন ব্যারিস্টার। বৃটিশ বারের সদস্য এই আইনজীবিকে তিনি গত বছরের আগষ্ট মাসে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা অপহরন করে নিয়ে যায় এবং আজ অবধি তার কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। আরো অনেক গুমের ঘটনার মত তিনিও রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে গেছেন। তার কোন খবরও আর পাওয়া যাচ্ছেনা।

সুলায়মান আলী: (অপহৃত আহমাদ বিন কাসেমের চাচাতো ভাই) অপহরনকারীরা অনেক রাতে ওর বাসায় এসেছিল। এর আগে বেশ কয়েকদিন তারা আমার চাচাতো ভাইকে অনুসরন করেছে, সে কখন বের হয়, কোথাও যায় ইত্যাদি তারা লক্ষ্য করেছে। তারপর সেই রাতে তারা আসে, তারা প্রথম এসে কড়া নাড়ে পরে আরমান দরজা খুললে তারা নাকে নিয়ে যায়। কিন্তু তারা আটক করার কোন কারন দেখাতে পারেনি। তারা তাকে তাদের সাথে নিয়ে যায়। তারা ঘরের ভেতরেও তল্লাশীর নামে অনেক হুলস্থুল করে। এতটাই কড়া ব্যবস্থাপনায় এবং হুট করে তারা কাজটা করে যে আরমান বাসার লোকদের কাছ থেকে ঠিকমত বিদায়ও নিতে পারেনি।

আহমাদ বিন কাসেম সেই সময়ে তার পিতা এবং বাংলাদেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা মীর কাসেম আলীর মামলায় আইনী সহায়তা দিচ্ছিলেন। পরবর্তীতে যাকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয়।

অনেকেই এখন টিউলিপ সিদ্দিকীর কাছে আবেদন করছেন যাতে তিনি বাংলাদেশের সরকারের সাথে কথা বলে আহমাদ বিন কাসেমকে মুক্ত করার ব্যপারে কার্যকর কিছু পদক্ষেপ নেন। এর কারন হলো: এই টিউলিপ সিদ্দিকীর খালাই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যিনি একই সংগে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেরও সভানেত্রী।

টিউলিপ সিদ্দিকীকে প্রায়শই তার খালার সাথে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সফরে হাসিমুখে সংগী হতে দেখা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে শেখ হাসিনা যখন মস্কোতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে সাক্ষাত করেন সেখানেও টিউলিপ সিদ্দিকীর সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। টিউলিপ যখন হ্যামস্টেডে তার নির্বাচনী এলাকায় নির্বাচনে জয় লাভ করেন তিনি সাথে সাথেই তার খালা শেখ হাসিনাকে স্মরন করেন এবং তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

টিউলিপ: আজকে সবচেয়ে বেশী মনে পড়ছে আমার খালাকে। আমি রাজনীতি করতে শিখেছি তার কাছেই। সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে কাজ করাও আমি তার কাছ থেকেই শিখেছি।

লেবার পার্টির ওয়েবসাইটে এর আগে টিউলিপ নিজেকে আওয়ামী লীগের মুখপত্র হিসেবেও দাবী করেছিলেন। যদিও সেটা তার ওয়েব সাইট থেকে পরবর্তীতে মুছে ফেলা হয় কিন্তু সেখানে এখনও আওয়ামী লীগের বহু সাফল্যগাঁথার গল্প ও ছবি দৃশ্যমান রয়েছে।

২০০৮ সালে টিউলিপ লিখেছিলেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিজয়ী হয়েছে। আমি অসম্ভব আনন্দিত।

এখানে টিউলিপ এখন মানবাধিকার রক্ষার পক্ষে সোচ্চার হলেও বাংলাদেশে তার খালার সরকারকে নিরন্তর সমর্থন করে যাচ্ছেন যারা খুবই দমন ও নিপীড়ন মুলক একটি কৌশলে দেশ শাসন করছে।

ডেভিড বার্গম্যান: এই সরকারের আমলে বিচার বহির্ভুত হত্যা এবং অপহরনের যে ঘটনা ঘটেছে তা ভয়াবহ এবং অতীতের সকল রেকর্ড ভংগ করেছে। অপহরনের শিকার যারা হয়েছে তাদেরকে গোপনে লুকিয়ে রাখা হয়। তারা কোথায় আছে কেউ তা জানেনা।
স্বাভাবিকভাবেই টিউলিপের মত আর কোন বৃটিশ এমপির সাথেই বাংলাদেশ সরকারের সেই মানের যোগাযোগ নেই। তাই আহমাদ বিন কাসেমকে মুক্ত করতে তিনি যে ভুমিকা রাখতে পারবেন, তেমন আর কেউই পারবেন না।

ডেভিড বার্গম্যান: টিউলিপ খুবই ভিন্ন সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন বৃটিশ এমপি। আমার মনে হয় গোটা বৃটিশ পার্লামেন্টে এমন আর একজন এমপিও নেই যার সাথে অন্য কোন দেশের শীর্ষ মহলের এত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। টিউলিপ সিদ্দিকীর পক্ষেই তাই এই ব্যপারে হস্তক্ষেপ করা সম্ভব। আমি বলিনা যে, তিনি উদ্যেগ নিলেই গুমকৃত সবাই মুক্তি পেয়ে যাবে। তবে এটা ঠিক যে, বাংলাদেশের বাইরে বাংলাদেশের সরকারের উপর প্রভাব বিস্তার করার মত তার চেয়ে প্রভাবশালী দ্বিতীয়টি আর কেউ নেই।

টিউলিপ: এটা এখন খুবই পরিস্কার যে, নাজানিন যখন আটক হয়েছে, তখন আসলে সে ছুটি কাটাচ্ছিল।

টিউলিপের এই সাম্প্রতিক সাক্ষাতকারের পর, আহমাদ বিন কাসেমকে নিয়ে প্রশ্ন করা হলে টিউলিপ আমাদেরকে জানিয়েছিলেন যে, তিনি এই বিষয়ে কিছুই জানেন না। এই কথাটি তিনি বার বার আমাদেরকে জানিয়েছেন। যদিও এরই মধ্যে নানা ভাবে বিভিন্ন মানবিক সংগঠন, আমাদের মত সাংবাদিক মহল এবং আইনজীবিদের বিভিন্ন ফোরাম থেকে তার কাছে বার বার আবেদনও পৌছানো হয়েছে যাতে তিনি এই ব্যপারে উদ্যেগ নেন।

চিঠির সংলাপ: আমি আশা করি এই চিঠিটি আপনি একজন মায়ের দৃষ্টিতে পড়বেন। এবং একজন সন্তান হারিয়ে গেলে তার মা যেভাবে আবেগতাড়িত হয়ে উঠেন সেটাও অনুভব করার চেষ্টা করবেন।

কিন্তু টিউলিপ এই ব্যপারে কোন সহায়তা করতে অস্বীকৃতি জানান।

আমরা এই ব্যপারে তার ব্যাখা জানার জন্য হামস্টেডে তার জনসভায়ও যাই এবং জানার চেষ্টা করি কেন এই ব্যপারে তিনি এতটা নিস্পৃহ।

প্রশ্ন: বাংলাদেশী নাগরিক আহমাদ বিন কাসেমের গুম হওয়ার ঘটনা নিয়ে আপনি কি ভাবছেন? যেখানে আপনার ঘনিষ্ট আত্মীয়রাই সেখানে দেশ চালাচ্ছেন।
টিউলিপ: আপনারা কার কথা বলছেন? আমাকে কেউ কিছু জানিয়েছে?
সাংবাদিক: জ্বী হা, তার পরিবার আপনার কাছে বার বার আবেদন জানিয়েছে, চিঠি পাঠিয়েছে।
টিউলিপ: কার কথা বলছেন, সে কি আমার নির্বাচনী এলাকার কেউ?
সাংবাদিক: না তা নয়। কিন্তু আপনি একটা ফোন করলেই তো অনেক কিছু হয়ে যেতে পারতো।
টিউলিপ: দু:খিত, আমাকে আগে বলেন তিনি কি হামস্টেডের কেউ? তিনি কি বৃটিশ নাগরিক?
সাংবাদিক: না তিনি একজন বাংলাদেশী।
টিউলিপ: আপনি কি জানেন যে আমি একজন বৃটিশ এমপি। আমি লন্ডনে জন্মেছি। আমি বাংলাদেশী রাজনীতিবিদ নই। তাই এই ব্যপারে আমার কোন আগ্রহ নেই।
সাংবাদিক: আমরা তা জানি কিন্তু..
টিউলিপ: শুনুন আমি একজন লেবার পার্টি এমপি, হামস্টেড এলাকা থেকে নির্বাচিত।
সাংবাদিক: কিন্তু আপনি তো একসময়ে নিজেকে আওয়ামী লীগের মুখপাত্র দাবী করতেন।
টিউলিপ: শুনুন আমি একজন লেবার এমপি। আমি এখানে জন্মেছি। আপনি কি আমাকে বাংলাদেশী বলতে চান। আমি একজন বৃটিশ এমপি, তাই যা বলবেন ভেবে বলুন, অন্যথায় আপনাদেরকে খারাপ পরিনতি ভোগ করতে হবে।
সাংবাদিক: কিন্তু একটা ফোন কল করতে আপনার অসুবিধা কোথায়?
(এ সময় টিউলিপ সাংবাদিকের সামনে থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে)

সে চলে যাওয়ার পরও তার অফিস ম্যানেজারও আমাদের সাথে এসে তর্ক করেন এবং আমাদের কাজে বাঁধা দেয়ার চেষ্টা করেন।
পরবর্তীতে আমাদের প্রযোজক তার কাছ থেকে প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়ার চেষ্টা করেন।

টিউলিপ: আমি বাংলাদেশী কেউ না। আর আপনারা যেই ঘটনার কথা বলছেন সেটা সমন্ধে আমার কোন ধারনাই নেই। আমি যা বলেছি এটাই আমার চুড়ান্ত বক্তব্য। আমি আর কিছু বলবোনা।

তারপর তিনি চ্যানেল ফোরের প্রযোজককে অপমানের পাশাপাশি হুমকিও দেন। যিনি সেই মুহুর্তে গর্ভবতী ছিলেন।

টিউলিপ: ধন্যবাদ ডেইসী আসার জন্য। আশা করি তুমি ভালমতই বাচ্চার জন্ম দিতে পারবে কেননা চাইল্ড লেবার খুবই কঠিন।
টিউলিপ সিদ্দিকী পার্লামেন্টের চিল্ডড্রেন ইকুয়ালিটি কমিটির একজন সদস্যও বটে।

যেই একটা কারণে তিনি আহমাদ বিন কাসেমের ব্যপারে সাহায্য করতে রাজী হলেন না তাহলো আহমাদ বিন কাসেম হামস্টেডের কোন নাগরিক নন।

অথচ এই টিউলিপ এর আগে একটি বাংলাদেশী অনলাইন পত্রিকায় সাক্ষাতকার দিতে গিয়ে বলেছিলেন ‘বাংলাদেশ বা বৃটিশ জানিনা, যেই বিপদে পড়ুক আমি তাকে সাহায্য করার সর্বাত্মক চেষ্টা করবো।

মাইকেল পোলাক: আমি ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে ঢাকায় গিয়েছিলাম। সেখানে অসংখ্য কুটনীতিকের সাথেও সেই সময়ে দেখা করেছিলাম।তখণ আমি আরমানের মুক্তির ব্যপারে করনীয় নিয়ে তাদের সাথে আলাপও করেছিলাম। তারা সবাই বলেছিলেন যে কেউ যদি এই ব্যপারে কোন ভুমিকা রাখতে পারে তাহলে তিনি হলেন টিউলিপ সিদ্দিক। তিনি একটু ফোন কল দিয়েও আরমানের মুক্তির ব্যপারে অবদান রাখতে পারেন।

এখন আহমাদ বিন কাসেম নিয়ে বিরাট রহস্য সৃষ্টি হয়েছে । সে কোথায় আছে কেমন আছে তার সবই অজানা। ঠিক একই রকম আরেকটি রহস্য সৃষ্টি হয়েছে এই টিউলিপ সিদ্দিককে নিয়েও যিনি বাংলাদেশী বৃটিশ সবাইকে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন তা সে যেখানেই হউক না কেন। অথচ এই আরমানের ব্যপারে তিনি সেটা করতে অস্বীকৃতি জানালেন।

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন

এ বিভাগের আরো খবর