ইতিহাসের সবচাইতে বড় শিক্ষা মানুষ কখনই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না

 

অর্থনৈতিক মুক্তি, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন থেকে রেহাই পেতে আগে নিজেকে যেকোন দাসত্বের শৃংখল থেকে মুক্ত করতে হবে”

[নাগরিক ভাবনা-নিয়মিত কলাম]

লেখক:এড. মোঃ সলীমুল্লাহ খান

salimullahআমি নিজেকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করছি দীর্ঘদিন যাবত, খুজে পাইনা নিজেকে, আমি অদৃশ্য মহা শক্তির তাবেদার, উল্লেখিত মহা শক্তির সাথে কিছু লোককে অসম লড়াই করতে দেখেছি। যদিও  এই শক্তির বাহিরে যাওয়ার কোন জায়গা নাই, নতুন করে পেলেও বুঝতে হবে ঐটার মালিকও সেই শক্তি, যিনি আমাদের সুশোভিত সুগঠিত ভাবে তৈরী করেছেন, যার নির্দেশ ছাড়া পৃথিবীতে শুধু, তাই নয় তামাম জাহানেই কোন কিছু হয়না। তিনি সকল ক্ষমতার উৎস, আমাদেরকে প্রচেষ্টা চালানোর নির্দেশ তিনিই দিয়েছেন এবং সত্যের জন্য হলে স্বয়ং সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাই দুনিয়ার কোন শক্তিরই স্থায়িত্ব নেই, মানুষের তৈরী সকল জিনিষই রিফুয়েলিং ব্যবস্থার অধীন। কিন্তু মহা শক্তিধর যা সৃষ্টি করেছেন তার ফুয়েলিং বা কোন চার্জ লাগেনা, তিনিই ঘোষণা করেছেন ”আমি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা দিয়ে থাকি, আর যাকে ইচ্ছা আবার গজব বা জিল্লতি দিয়ে সম্মান কেড়ে নিয়ে থাকি”।

উপরে আমার ব্যাক্তিগত মৌলিক বিশ্বাস ও আস্থার কথা আগে বলে নিলাম, এরপর প্রাসঙ্গিক কথার অবতারনা করছি ||

কেন নিজের বিশ্বাসের কথা আগে বলে নিলাম, তার কারণ হলো আজকের লেখার বিষয়বস্তুটি অতীব কঠিন। যে কোন মুহূর্তে আমি আমার বিশ্বাসের নিষিদ্ধ গলি পথে ঢুকে যেতে পারি মনের অজান্তে। ০৬/০৫/২০১৬ইং আমার  বাবার ১৮ তম মৃর্তু বার্ষিকী, তার পদাংক অনুসরন করতে গিয়েই আমি বিভিন্ন কঠিন বিষয়েও লেখার অনুপ্রেরণা পেয়েছি। যাহোউক মানুষের জীবনের মৌলিক সামাজিক দুটি পার্টের কথা আমি শিরোনামে উল্লেখ করেছি, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সাংস্কৃতিক গোলামী থেকেও মুক্তি। এই দুটি বিষয় আমরা প্রায়ই বিভিন্ন লেখক আলোচকের মুখ থেকে উচ্চারিত, ধ্বনিত হতে দেখেছি। ছাত্রজীবনে মজাদার আকর্ষনীয় শ্লোগান দিয়ছিলাম, মিছিলে শোনেছিলাম, বিভিন্ন ক্যাম্পাসে সুন্দর সুন্দর দেয়ালে লেখা দেখেছি, এটাও একটা সংস্কৃতি ছিলো যা আমরা মনের অজান্তেই হারিয়েছি।

 এখন ছাত্র নেতা মানেই টাকা ইণকামের পথ, তখন ছিলো টাকা সময় খরচ করার পথ, অভিভাবকদের বকুনি ছেলে বা মেয়েটি একদম বখে গিয়েছে, কিন্তু তখনকার ছাত্র রাজনীতি মানে ছিলো যে কোন বিষয়ে প্রথম হওয়ার চেষ্টা করা। দেখতামও সেটাই যে ছেলেটি শ্লোগানেও দারুন, ওয়াল রাইটিংয়েও দারুন, চারিত্রিক মাধুর্যতাতেও দারুন, এমনকি লেখা পড়া রেজাল্টেও দারুন, কবিতা আবৃতী, গান, নৃত্যকলা, আর্ট, ফ্যাশণ, অভিনয় এসব যারা করতেন তারা ছিলেন দ্বিতীয় কাতারে। কিন্তু এখন এগুলো কোথায় হারিয়ে গেলো যুগের কোন দিগন্ত রেখায়।৮০ দশকেও এগুলো পারস্পরিক দান্ধিকতায় টিকে ছিলো যা এখন টিকে নেই, এটাকে আমি বলবো অর্থনৈতিক মুক্তি ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শীকার হয়ে আমরা তা হারিয়েছি।

এখানে অর্থনৈতিক মুক্তি শব্দটি ব্যবহার করেছি এই অর্থে যে অর্থনৈতিক মুক্তি চাইতে চাইতে আমরা আজ অর্থের গোলামে পরিনত হয়েছি। রাজনৈতি চৌর্য্যবৃত্তি আগে কোন সাধারণ ছাত্রনেতাও করতোনা এখন রাজনীতির পরিমন্ডলে এটাই যেন একমাত্র উদ্দেশ্য। তাই জাতীয় চরিত্রের এই অধঃপতন, বিনা রডে বা রডের বদলে মুলি কিংবা বরাক বাঁশ দিয়ে বিল পাস করিয়ে নিচ্ছেন কেননা জাতীয় মঞ্চে আরোহীতরাইতো বিনা ভোটে নির্লজ্জ বেহায়ার মতো ক্ষমতা দখল করে রেখে। আবার অন্দেরকে রাজনীতির পাঠ শিখাতে আসেন।

কোন এক সময় শোনেছিলাম আমাদের যে কয়টা ট্যাংক ছিলো তার সবকটি ভারতের দিকে তাক করে রাখতে নির্দেশ দিতেন তাতে নাকি সৈনিকেরা মনোবল পেতেন, কেননা স্বাধীনতার সময়ের মিত্র ভারতই কিন্তু আমাদের অঘোষিত চরম শত্রু। আজ সাংস্কৃআগ্রাসনের শীকার আমরা এমনভাবে হয়েছি যে আমরা মানসিকভাবে এক অতীব দূর্বল জাতিতে পরিনত হয়েছি। এখন বলতে শোনা যায় আরে বাপরে ভারত এতো বড় দেশ যেখানে ঘুড়ে আসলে তাবৎ দুনিয়া দেখে এসেছি বললে ভুল হবেনা। এ কথার সাথেও আমি একমত, কিন্তু  একথার সাথে আমি কিভাবে একমত হই যে ভারত এতবড় শক্তি যে তার যদি প্রস্রাব করে দেয় আমরা ভেসে যাবো।

 সেটা হওয়ার কারনও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন কেননা আমরা স্যাটেলাইটের যুগে আমরা নিজেদের কে অন্যের চোখে অতীব ক্ষূদ্রই দেখি, আর একটু চিন্তা করিনা আমাদের চ্যানেলকে ভারতের আকাশে চলতে দেয়া হয় টাকাও দেই তাদের প্যাকেজ কিনে আমরা দেখি, কিন্তু আমাদের কোন চ্যানেল ডাবল টাকা দিলেও দেখাতে দেয়না। কেননা আমরা যে সংখ্যা তাদের থেকে কম হতে পারি কিন্তু আমাদের যে সমৃদ্ধ ইতিহাস আমাদের যে বিগ কর্ম কান্ড তাহা দেখলে আমরা উজ্জেবিত হবো তাই আমাদে দেখতে দেয়না। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন ”আমাদেরকে দাবায়া রাখতে পারবানা” এই জন্যেই অর্থাৎ আমাদেরকে দাবায়া রাখার জন্যেই এই প্রয়াস”।

আমরা বাংলাদেশী হিসাবে গড়ে উঠতে যাতে না পারি, তাই কিছু লোককে দালালে পরিনত করা হয়েছে যাদের কর্মকান্ড স্বাধীনতা বিরোধীদের থেকেও খারাপ। কেননা যারা স্বাধীনতার বিরোধীতা করেই ক্ষ্যান্ত ছিলো কিন্তু এরা আমার সর্বস্ব নিয়েও ক্ষ্যান্ত হবে কিনা সন্দেহ আছে। আজ ব্লগার সংস্কৃতি চালু হয়েছে উন্নত বিশ্ব উদ্ভিঘ্ন তাদের উপর চোরাগোপাতা হামলা হচ্ছে,  বিদেশীরা তাও একটা পক্ষ নিয়েছেন কিন্তু আমার দেশের সরকার যেন দুই নৌকায় পা দিয়েছেন তাই এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পক্ষ নিচ্ছেননা। তাই এই সব হত্যাকান্ড বেড়েই চলেছে, আজ আমার নতুন এক সাংবাদিক বন্ধু আমার মাথায় একটা কথা পুশ করে দিয়েছেন ভেবে দেখলাম তিনি সত্যিই দারুন, একটি সত্যিই প্রকাশ করেছেন, তার আরেকটা কথা আমার দারুন মনে ধরেছে যে পৃথিবীতে বড় একটা আইন চালু ছিলো যে প্রকৃতির বিরোদ্ধে কোন কথা ও কাজকে আজো বিভিন্ন দেশে অপরাধ হিসাবে গন্য করা হয়।

 আজ থেকে ২৫/২৬ বছর আগে আমার বাবা সুলেখক এ,কে,এম, আলী আকবর খান তার প্রিয় ছাত্রে লেখক হুমায়ুন আহমেদের প্রতি অনুরাগ দেখাতে গিয়ে বিশিষ্ট চিত্র শিল্পি ও লেখক জনাব নাসির আলী মামুনের একটি লেখা ”একজন প্রথা বিরুধীর গল্প” এর সমালোচনামূলক লেখাতে এই বিষয়ে দারুভাবেই আলোকপাত করেছিলেন। যে প্রথা বিরোধীতা কোন উল্লেখযোগ্য কর্ম হতে পারেনা, আমরা সকল প্রথার বিরোধীতা করতে পারি এমন সব স্থায়ী প্রথা রয়েছে। তা কি আমরা ভাঙ্গতে পারবো, না পারি। আমি আমার একটি নোট লিখেছিলাম যেমন, ”সৃষ্টির শোভনীয় মানদন্ড নিয়ে বলেছিলাম যে ”পৃথিবীতে একমাত্র মানুষ ছাড়া আর কোন প্রাণী অভুক্ত থাকেনা বা খালিপেটে বাড়ি ফিরতে হয়না” আরেকটা নোট লিখেছিলাম যে ” একমাত্র মানুষ ছাড়া আর কোন প্রাণীর গুপ্ত অংগ সরাসরি চোখে পরেনা এমনভাবেই প্রকৃতিগতভাবেই সৃষ্টি করা হয়েছে, কেননা স্রষ্টা জানতেন যে মানুষ নিজেই তাদের পরিধান তৈরী করবে। কেননা এ তৈরীর জ্ঞান মানুষকে স্রষ্টাই দিয়ে দিয়েছেন, তাই আমাদের এমন কর্ম করা সঠিক নহে যাহার মাধ্যমে শুধু নিজেদেরই ধ্বংস ডেকে আনবো। তা নয় পৃথিবীকেও ধ্বংসের দ্বার প্রন্তে নিয়ে যাবো। যেমন এখন সংস্কৃতি হলো সম লিঙ্গের সেক্স চাহিদাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়া, এতে পৃথিবী যেমন থেমে যাবে তেমনি প্রাকৃতিক দূর্যোগও টেনে আনবে।

কেননা আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেইনা, তাহা আমি শিরোনামেই উল্লেখ করেছি, আমরা বা আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমি এই বাংলাদেশ আজ চরম বিকৃত সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার। নগ্ন-দানবীয় সংস্কৃতি বাংলাদেশের অস্তিত্ব, জাতিসত্তা, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, তাহযীব-তামাদ্দুন, ঐতিহ্য বিশ্বাস ও মূল্যবোধের ওপর প্রচণ্ড হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। স্যাটেলাইট সংস্কৃতির দাপটে আমাদের সবকিছু যেন হারাতে বসেছি। দিবা-রাত্র প্রতি মুহূর্তে বিভিন্ন চ্যানেলে উলঙ্গ সংস্কৃতির ছোবলে ক্ষত-বিক্ষত করে দিচ্ছে আমাদের সব কিছু। সমাজে দ্রুত মূল্যবোধের পরিবর্তন সূচিত হচ্ছে। যেমন- পরিবারিক বন্ধনে শিথিলতা আসছে। পবিত্র ও অনাবিল শান্তিময় দাম্পত্য জীবনকে বন্দীজীবন মনে করা হচ্ছে। পিতা-মাতা ও আপনজনকে আপদ মনে করা হচ্ছে। বিবাহ প্রথাকে নারী নির্যাতনের হাতিয়ার মনে করা হচ্ছে। জরায়ুর স্বাধীনতার দাবি উঠছে। লিভ টুগেদারের ফজিলত বর্ণনা করে পত্র-পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আহ্বান জানানো হচ্ছে এবং বিভিন্ন মিডিয়ায় এর প্রতি উৎসাহিত করা হচ্ছে। বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে টিভি-রেডিওতে এইডস নামক মারাত্মক ব্যাধির প্রতি নিরুৎসাহিত না করে বরং “বাজি লাগবার” আহ্বান জানিয়ে অবাধ যৌনতার প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে। সমকামিতাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য সরকারকে আজ আহবান জানানো হচ্ছে। অথচ মহান আল্লাহ এই নিকৃষ্ট অপরাধের জন্য হযরত লুত (আ.) এর পুরো কাওমকে ধ্বংস করে দিয়েছে। মুসলিম পর্দা প্রথাকে তিরস্কার করা হচ্ছে অথচ নারীদেরকে বিভিন্ন মডেলিং এর আবরণে বাজারি পণ্যে পরিণত করা হচ্ছে ||

 

লাইন্সেধারী বেশ্যাবৃত্তি চালু রাখা হচ্ছে। লাইসেন্সবিহীন অবাধ যৌনতার নগ্ন প্রসার ঘটানোর জন্য দৈনিক সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, সাহিত্য, পাঠ্যপুস্তক, চলচিত্র, নাট্যশালা, সঙ্গীত নিকেতন, আর্টস্কুল, ফ্যাশন শো, অবকাশ কেন্দ্র, সমুদ্র সৈকত, মোটেল, পার্ক, গার্ডেন, পর্ণশো এবং পর্ণগ্রাফির মাধ্যমে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে অন্ধকারময় পথে পরিচালিত করছে; তা আজ ভাবতেও ঘৃণা লাগে। এ সবের মাধ্যমে জাতিকে কোথায় নিয়ে যেতে চাচ্ছে তা দেখার যেন কেউ নেই। ভোগবাদী এই নগ্ন-যৌন সংস্কৃতি ঠেকাবার মতো কোন কর্তৃপক্ষ আছে কিনা তার কোন অস্তিত্ব আমরা দেশে লক্ষ করছি না। এমনকি মানবতাকে রক্ষা করার জন্য ভোগবাদী এই বিশ্বের কোথাও কোন কর্তৃপক্ষ এগিয়ে আসার লক্ষণ অনুভূতি হচ্ছে না ||

 

পরিশেষে বলতে চাই, আমরা জাতিতে মুসলমান। দেশ হিসেবে বাংলাদেশি মুসলিম। ভাষা হিসেবে বাঙালি মুসলিম। আমাদের সংস্কৃতি ইসলামী সংস্কৃতি। তবে আমাদের সংস্কৃতিতে দেশজ, ভাষাগত এবং পারিপার্শ্বিক ধর্ম ও সংস্কৃতি থেকে কিছু ভেজাল ও অপসংস্কৃতি ঢুকে পড়েছে। পারিপার্শ্বিক সমাজ, অন্যান্য ধর্ম ও দর্শন থেকে আসা এমনকি না বুঝার কারণে ধর্মাচারের নামে পুন্যের বাসনায় অনেক শিরক-বিদআতের অপসংস্কৃতির অনুষঙ্গ যোগ হয়ে পরিচ্ছন্ন ইসলামী সংস্কৃতির অবয়বকে কালিমাময় করছে। তাছাড়া বিজাতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকারে পরিণত হয়ে আমদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে টালমাটাল করে তুলেছে।আমাদের জাতিসত্বাকে বাচাতে আমাদের সবারই কিছুনাকিছু করনীয় রয়েছে তা আমরা এড়িয়ে যেতে পারিনা, সবাইকে তার করনীয় করার তৌফিক যেন সৃষ্টি কর্তা প্রদান করেন, এ কামনায় আজকের মতো শেষ করছি (অসমাপ্ত)।

rosegarden.khan@gmail.com

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন

এ বিভাগের আরো খবর