একতাই বল-ফ্রান্স সফরে নিস্তেজ শেখ হাসিনা: ব্যারিস্টার সায়েম

সময় বাংলা ডেস্ক: একঃ ফরাসিরা বীরের জাতি। বিপ্লবের মাধ্যমে তারা রাজতন্ত্রের পতন ঘটায়। ১৭৮৯ সালের ১৪ই জুলাই ছিলো মানব সভ্যতার ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিন। এ দিনটিতেই মহান বিপ্লবের সূচনা হয়। পরের দশ বছর দুনিয়াবাসী অবাক চোখে প্রত্যক্ষ করেছিলো মানবাধিকার ঘোষণা, প্রজাতন্ত্রের উদ্ভব, সামন্ততন্ত্র ও যাজকতন্ত্রের উচ্ছেদ এবং গণতন্ত্রের হাত ধরে এক আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সূচনা। তবে বিপ্লব প্রতি-বিপ্লবের ঘনঘটায় ১৭৯৯ সালে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের ক্ষমতা দখল নয়া রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা কিনা সে বিষয়েও পরস্পরবিরোধী মতামত রয়েছে।

তো ফরাসি বিপ্লবের নান্দনিকসব দিক নিয়ে আজ নয়, অন্য একদিন আলোচনা করবো। আজ শুধু আমার বিচারে সে বিপ্লবের সবচেয়ে বড় দুটি অর্জনের কথা বলেই ইতিহাসচর্চা ক্ষান্ত দেবো। প্রথমটি হচ্ছে গণতন্ত্র এবং দ্বিতীয়টি আইনি সমতা। ফরাসী বিপ্লব একদিকে খোদা-প্রতিভূ রাজা ষোড়শ লুই কে সাধারণ নাগরিকের কাতারে নামিয়ে এনেছিলো আর অন্যদিকে বিনা খরচে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ে পৌঁছে দিয়েছিলো বিচারব্যবস্থা।

দুইঃ ফ্রান্সের মাটিতে ফরাসী বিপ্লব শুরু হওয়ারও ৩২ বছর আগে বঙ্গদেশের স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয় পলাশীর প্রান্তরে। একপক্ষে নবাব সিরাজউদ্দৌলার বাহিনী, অন্যপক্ষে রবার্ট ক্লাইভের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। জগৎ শেঠ, উমি চাঁদ, মীর জাফরদের বিশ্বাসঘাতকতায় যুদ্ধের ভাগ্য যখন পশ্চিমাকাশে হেলতে শুরু করেছে, লড়াই করতে করতে মীর মদন ও মোহন লাল যখন শহীদের মর্যাদা বরণ করেছেন আর নবাবের পরাজয় যখন অবধারিত তখনও মৃত্যু নিশ্চিত জেনে বীরত্বের সাথে তলোয়ার চালিয়ে যাচ্ছিলেন একজন যোদ্ধা। তিনি ফরাসী সেনাপতি সিন ফ্রে, বীরত্ব ও বিশ্বস্ততার জন্য যার নাম এখনো শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়। পলাশীর রণাঙ্গন থেকে পলায়নের পরও পথিমধ্যে বন্দি হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বাংলার ভাগ্যাহত শেষ নবাব রাজ্য ফিরে পেতে ফরাসিদের ওপরই আস্থা রেখেছিলেন। একবার পশ্চিমে পৌঁছাতে পারলে সেনাপতি মসিয়ে নাস তাকে সাহায্য করবেন মিত্রদের সাথে মিলিত হতে এবং রাজধানী পুনরুদ্ধার করতে এমন আশাতেই বুক বেঁধে ছিলেন নবাব।

তিনঃ সাংগঠনিক প্রয়োজনে ফ্রান্সের মাটিতে আমি প্রথম পা রাখি ২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে। সত্যি বলতে কি, দায়িত্ব পাওয়ার পর সেটাই ছিল কোন দেশে আমার প্রথম সফর। শুনেছিলাম, সেখানে বিএনপির রাজনীতি বহুধা বিভক্ত। তাই নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করাটাই ছিল আমাদের মূল লক্ষ্য কিংবা চ্যালেঞ্জ। তবে কাজ করতে গিয়ে যে বিষয়টি শুরুতেই আমাকে অভিভূত করে তা হলো, ফ্রান্সে যারা বিএনপির রাজনীতির সাথে যুক্ত তাদের অধিকাংশই অতীত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন যা তাদের সক্ষমতাকে বিকশিত করেছে। আমাদের প্রচেষ্টা নিশ্চয়ই ছিল, কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে কার্যকরী হয়ে উঠেছিলো দলের প্রতি ফ্রান্স বিএনপির নেতাকর্মীদের আন্তরিকতা, আনুগত্য ও বিশ্বস্ততা। আমরা তাই সফল হয়েছিলাম প্রথম দফাতেই। দল ও দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে আমাদের ফ্রান্সবাসী সহকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল ৭ই নভেম্বরের ঐতিহাসিক দিনে। ফলশ্রুতিতে বহু বছর পর সেখানে বিএনপির অনুমোদিত কমিটি আসে এবং ভুলে যাওয়ার মতো কিছু ঝুটঝামেলা বাদ দিলে মোটামুটি সাফল্যের সাথেই তারা তাদের মেয়াদ পূর্ণ করে। দরকার পড়লে ফ্রান্স বিএনপি যে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে পারে সে প্রমাণ আমরা বহুবার পেয়েছি, কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা হলো, চাইলে সেরাও হতে জানে।

চারঃ শেখ হাসিনা বিদেশ ভ্রমণে যেখানেই যায় সেখানেই বিএনপি ও প্রবাসী বাংলাদেশীদের তোপের মুখে পড়ে। তার আগমনে সর্বত্রই অনুষ্ঠিত হয় প্রতিবাদ-বিক্ষোভ সমাবেশ, অনুমতি মেলে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও। পশ্চিমা দেশগুলোতে এমনটাই রীতি। কিন্তু সময়ের বাস্তবতায় ‘ওয়ান প্ল্যানেট সামিট’এ যোগ দিতে আসা হাসিনার বিরুদ্ধে প্যারিসের প্রাণকেন্দ্রে বিক্ষোভ সমাবেশের অনুমতি পাওয়া যাবে এমনটা এবার শেষ মুহূর্ত পর্যন্তও অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছিলো। কিন্তু ফ্রান্স বিএনপির নেতৃবৃন্দের নিরলস পরিশ্রম ও দক্ষ যোগাযোগের ফলে ১২ই ডিসেম্বর হাসিনার হোটেলের অনতিদূরেই সমাবেশের অনুমতি মেলে।

পাঁচঃ প্যারিসে হাসিনাবিরোধী এবারের বিক্ষোভ সমাবেশ ছিলো আমার দেখা অন্যতম সেরা কর্মসূচি। ফ্রান্স বিএনপি এতো নিখুঁতভাবে তাদের আয়োজন সম্পন্ন করে যা রীতিমত অন্যদেরও অনুকরণীয়। এয়ারপোর্ট থেকে হোটেল কিংবা সমাবেশস্থলে অতিথিদের নিয়ে আসা থেকে শুরু করে লোকসমাগম ও বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের আপ্যায়ন ও দেখভাল করা পর্যন্ত যা কিছু দায়িত্ব ছিল সবই দক্ষতার সাথে পালন করেছে ফ্রান্স বিএনপির নেতাকর্মীরা। পুরো বিষয়টি যে ছিল একটি টীমওয়ার্ক, তা পরতে পরতে টের পেয়েছি আমরা সবাই। সকল বিভাজন ভুলে ফ্রান্স বিএনপি ঐক্যবদ্ধ হয়েছে দেশ ও দলে স্বার্থে। তারা প্রমাণ করেছে, “ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ।”

ছয়ঃ স্পেনের কর্মীসভায় বলেছিলাম, “গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সফলতার মূলমন্ত্র হচ্ছে ঐক্য।” ঐক্যবদ্ধ ফ্রান্স বিএনপিও দেখিয়ে দিয়েছে, একতাই বল। তাদের ঐক্যের কাছে পরাজিত হয়েছে আওয়ামী লীগের পেশীশক্তি। এই প্রথমবারের মতো বিদেশের মাটিতে শেখ হাসিনা বা তার আওয়ামী লীগের কোন বাগাড়ম্বর আমরা শুনতে পাইনি, বাজেনি কোন ঢাকঢোলও।

সাতঃ সেরাটুকু পেতে গেলে ঐক্যের কোন বিকল্প নেই। ঐতিহাসিকভাবে যে ফরাসি জাতির বীরত্বের গল্পগাথা আমাদের আজো মুগ্ধ করে, তাদের মাটিতেই প্রমাণিত হয়েছে, ‘ঐক্যবদ্ধ বিএনপির কাছে হাসিনা অসহায়।’ এটি কাকতালীয় নয়, বিপ্লবীদের আদর্শিক যোগসূত্র।

আটঃ প্যারিসের ঐক্য ছড়িয়ে পড়ুক বিএনপির প্রতিটি নেতাকর্মীর মাঝে, দেশে ও বিদেশে। ঐক্যের শক্তি উপড়ে ফেলুক স্বৈরতন্ত্রের ভিত।

সবাইকে বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা।

বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার আবু সায়েমের ফেইসবুক থেকে সংগৃহিত।

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন