এবার মমতাজের কী হবে?

সময় বাংলা ডেস্ক: মানিকগঞ্জ-২ আসনটি নিয়ে বিএনপির প্রার্থী নির্ধারণে তেমন জটিলতা না থাকলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে রয়েছে জটিলতা। আর মহাজোট হলে সে ক্ষেত্রে প্রার্থী জাতীয় পার্টি থেকে হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। বিএনপি, জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোটামুটি অনেকটা নিশ্চিত থাকলেও আওয়ামী লীগে আসতে পারে চমক।

হরিরামপুর, সিঙ্গাইর ও মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন নিয়ে মানিকগঞ্জ-২ আসন গঠিত। প্রথম থেকে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানিকগঞ্জের আসন ছিল চারটি। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আসন পুনর্বিন্যাস করে মানিকগঞ্জ-৪ আসনটি ভেঙে মানিকগঞ্জ-২ আসনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফলে মানিকগঞ্জের আসন সংখ্যা চারটি থেকে কমে তিনটি হয়।

মানিকগঞ্জ-২ আসনে হরিরামপুর উপজেলার সাথে মানিকগঞ্জ-৪ আসনের নির্বাচনী এলাকা সিঙ্গাইর উপজেলা ও সদর উপজেলার তিনটি ইউনিয়নকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ ছাড়া শিবালয় উপজেলাকে বাদ দিয়ে মানিকগঞ্জ-১ আসনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে আসনটি ছিল ঢাকা-২ ও ঢাকা-৪ আসন। ১৯৮৪ সালে মহকুমা থেকে জেলায় উন্নীত হলে আসনটি মানিকগঞ্জ-২ ও মানিকগঞ্জ-৪ হয়; যা জাতীয় সংসদের ১৭৩ ও ১৭৫ নম্বর আসন ছিল। ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ দু’টি আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে সংসদ সদস্য হন মোসলেম উদ্দিন খান হাবু মিয়া ও মীর আবুল খায়ের ঘটু।

১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য হন বিএনপির প্রার্থী ক্যাপ্টেন (অব:) আব্দুল হালিম চৌধুরী ও শামসুল ইসলাম খান নয়া মিয়া। ১৯৮৬ সালে তৃতীয় সংসদ ও ১৯৮৮ সালে চতুর্থ সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হনÑ জাতীয় পার্টির নেতা ডা: লুৎফর রহমান ও গোলাম ছরোয়ার মিলন।

১৯৯১ সালে পঞ্চম, ১৯৯৬ সালে ফেব্রয়ারি মাসে ষষ্ঠ, ১৯৯৬ সালের জুন মাসে সপ্তম ও ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য হন প্রয়াত বিএনপি প্রার্থী মরহুম হারুনার রশিদ খান মুন্নু ও শামসুল ইসলাম খান নয়া মিয়া। এ আসনে নয়া মিয়া চারবার এবং হারুনার রশিদ খান মুন্নু চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। নয়া মিয়া সরকারের শিল্পমন্ত্রী ও মুন্নু দফতরবিহীন মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

নয়া মিয়ার মৃত্যুর পর তার আসনে উপনির্বাচনে বিএনপি দলীয় মনোনয়ন নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তার ছেলে ইঞ্জিনিয়ার মঈনুল ইসলাম খান শান্ত। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদের নির্বাচনে নবগঠিত সংসদীয় এলাকায় বিএনপি দলীয় প্রার্থী হন মুন্নুর মেয়ে আফরোজা খান রিতা। নবম সংসদ নির্বাচনে তাকে পরাজিত করে এই আসনে সংসদ সদস্য হন ১৪ দলীয় জোটের প্রার্থী জাতীয় পার্টির নেতা এস এম আব্দুল মান্নান। ২০১৪ সালের ১০ম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেয়া হয় কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগমকে। ওই বার বিএনপি অংশগ্রহণ না করায় বিনাভোটে নির্বাচনে মমতাজ বেগম বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচনেও দলের মনোনয়ন চাইবেন তিনি।

তবে এবার মনোনয়ন প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নতুন চকম হিসেবে নাম উঠে এসেছে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এ আসন থেকে উপনির্বাচনসহ পাঁচবার আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী অ্যাডভোকেট গোলাম মহীউদ্দীনের। দলের হাইকমান্ড তার মনোনয়নের বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বের সাথে ভাবছেন বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একটি সূত্র।

অপর দিকে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও এই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এস এম আব্দুল মান্নান জানান, আওয়ামী লীগের সাথে জাতীয় পার্টির মহাজোট হলে তার মনোনয়ন নিশ্চিত। মহাজোট না হলেও তিনি জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে এবার নির্বাচন করবেন।
জাতীয় পার্টির আমলে শিক্ষা উপমন্ত্রী ছিলেন গোলাম ছারোয়ার মিলন। তিনিও এই আসনে নির্বাচন করতে চাচ্ছেন।

এ ছাড়াও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাবেক যুব ও ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক দেওয়ান শফিউল আরেফীন টুটুল, মানিকগঞ্জ জেলা পরিষদের সদস্য, জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ও ঢাকা উত্তর আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার সালাম চৌধুরী, হাটিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মানিকগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য গোলাম মনির হোসেন, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ডা: আলী জিলকদ আহমেদ। প্রত্যেকেই জনসংযোগ করছেন। হরিরামপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলজার হোসেন বাচ্চু বলেন, আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের কাণ্ডারি, এ আসন (শিবালয়-হরিরামপুর) থেকে পাঁচবার যিনি নির্বাচন করেছেন নেত্রীর নির্দেশে, আগামী সংসদ নির্বাচনে দলের নেতাকর্মীরা এ ত্যাগী নেতা অ্যাডভোকেট গোলাম মহীউদ্দীনকেই দলীয় প্রার্থী হিসেবে দেখতে চান। সব শ্রেণী পেশার মানুষের কাছে তিনি কতটা জনপ্রিয় গত জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রমাণ মিলেছে। তিনি দলের পরীক্ষিত যোদ্ধা, বসন্তের কোকিল নয়।

এ দিকে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা তাদের নির্বাচনী এলাকায় দলীয় কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সামাজিক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগদানের মধ্য দিয়ে নির্বাচনে তাদের প্রার্থিতার কথা জানান দিচ্ছেন জোরেসোরে। এ আসনে বিএনপির জোরালো প্রার্থী দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য, জেলা বিএনপির সভাপতি ও এ আসন থেকে নবম সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী আফরোজা খান রিতা ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক, সাবেক সংসদ সদস্য, সাবেক শিল্পমন্ত্রী মরহুম শামসুল ইসলাম খান নয়া মিয়ার ছেলে ইঞ্জিনিয়ার মঈনুল ইসলাম খান শান্ত।

দলীয় সূত্রের বরাত দিয়ে বিএনপির বেশ কয়েক জেলা নেতা জানান, বিগত সময়ে মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল আর হাইকমান্ড এবার সেই হারানো সুনাম ফিরিয়ে আনতে যেকোনো চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত। সে ক্ষেত্রে জেলা সভাপতি আফরোজা খান রিতার বাবা সাবেক মন্ত্রী হারুনার রশিদ খান মুন্নুর পুরো জেলায় রয়েছে জনপ্রিয়তা। আর ওই সুনাম কাজে লাগিয়ে তার মেয়ে রিতাকে দিয়ে মানিকগঞ্জের অপর দু’টি আসন অর্থাৎ মানিকগঞ্জ-১ (শিবালয়-ঘিওর-দৌলতপুর) ও মানিকগঞ্জ-৩ (মানিকগঞ্জ সদর-সাটুরিয়া) আসনে দলীয় প্রার্থী করার সম্ভাবনা রয়েছে। মানিকগঞ্জ-৩ আসনে তার দলীয় মনোনয়ন অনেকটাই নিশ্চিত। মানিকগঞ্জ-১ আসনে দলের বিজয় নিশ্চিত করতে তাকে প্রার্থী করা হবে বলে জোরেসোরে শোনা যাচ্ছে।

এ ক্ষেত্রে মানিকগঞ্জ-২ অর্থাৎ এ আসনে বিএনপির নিশ্চিত প্রার্থী এখন ইঞ্জিনিয়ার মঈনুল ইসলাম খান শান্ত। দলীয় নেতাকর্মীরা এমনটা ধরে নিয়েই কাজ শুরু করেছেন। এ ছাড়াও বিএনপির মনোনয়ন চাইবেন সিঙ্গাইর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবিদুর রহমান খান রোমান।

আওয়ামী লীগ আর জাতীয় পার্টির মধ্যে জোট না হলে সে ক্ষেত্রে এ আসনে বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জাপা নেতা এস এম আব্দুল মান্নানের মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই হবে। এ ক্ষেত্রে অনেকটা এগিয়ে থাকবে বিএনপির প্রার্থী। অন্য দিকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী নির্ধারণের ওপর নির্ভর করবে আওয়ামী লীগ কতটা প্রতিন্দ্বন্দ্বিতা করতে পারবে এবং তাদের জয়-পরাজয়। সবমিলিয়ে নদীভাঙা এলাকার মানুষের প্রত্যাশা সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে তারা তাদের যোগ্য নেতা নির্বাচন করবেন।

সূত্র: নয়াদিগন্ত

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন

এ বিভাগের আরো খবর