কথ্য ভাষায় আঞ্চলিকতা নিয়ে বিতর্ক একপ্রকার মাস্তানি

আরিফুল ইসলাম সাব্বির: বলার ভাষায় আঞ্চলিকতা থাকাটা অপরাধ নয়,বরং জন্মগত রাইট। মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকারের জন্যে পৃথিবীতে একমাত্র বাঙালিরাই নিজের জীবন দিয়েছে। পৃথিবীজুড়ে সেই আন্দোলনের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ দিতে পালন হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। উর্দু চাপানো হতো অফিসিয়াল লেখার ভাষায়,সেইটাই আমরা মেনে নিই নি, আন্দোলন করে প্রতিহত করেছি।
সেখানে যখন কোন বাঙালিই কারো বলার ভাষার উপর নিষেধাজ্ঞা বসাতে চায়, তাকে চূড়ান্ত মাত্রার উগ্রবাদী মনে হয়।

ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন, মৌলভিবাজারের সন্তান, কথা বলার সময় চলিত ভাষার সাথে সাথে আঞ্চলিকতাকেও মিশিয়ে ফেলেন, সেটা টিভি টকশো হোক, বড় সমাবেশ, প্রধানমন্ত্রীর সামনে হোক, আলোচনা সভা এমনকি কারো সাথে আড্ডাতেও তিনি এভাবেই কথা বলেন।

সিপিবি ঢাকা কমিটির একাদশ সম্মেলনের সময় সকল রাজনৈতিক সংগঠনে দাওয়াত কার্ড পৌঁছানোর দায়িত্ব পালনকালে প্রায় আধাঘন্টার মত আড্ডা দেবার সুযোগ হয়েছিলো, সেখানে তার আড্ডার ভাষা ঠিক এরকমই, যেরকম তিনি সব জায়গায় বলেন। ভদ্রতা দেখাইয়া একবার শুদ্ধ লেখার ভাষা,আরেকবার এলাকার ভাষা বলেন না।
বঙ্গবন্ধুও তার কোন ভাষনে শুদ্ধ বইয়ের ভাষায় কথা বলতেন না।
বর্তমান সময়ে যার বক্তব্য সবার খুব পছন্দ,মাননীয় রাষ্ট্রপতি,তিনিও নিজের অঞ্চলের ভাষায় কথা বলতেই বেশি পছন্দ করেণ, সেই বক্তব্য জনপ্রিয়ও হয়।
ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি হাসান তারেক ভাই’র বক্তব্যেও আঞ্চলিকতার একটা রেশ ছিলো, তিনি সাধারণত আড্ডায়ও ওভাবেই কথা বলেন।তাতে তার বক্তব্য কেউ যে পছন্দ করতো না তেমন কিন্ত না।
ছাত্র ইউনিয়ের সাবেক সভাপতি মানবেন্দ্র দেবও অনেকগুলা আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে পারেণ, নতুন কোন ছেলেমেয়ে যখন নেতার মুখ থেকে নিজের এলাকার ভাষায় কথা শোনেন,তারা আরো আকৃষ্টই হোন,পুলকিত বোধ করেণ।
ফেসবুকে ভালো কয়েকজন লেখকের নামও বলা যেতে পারে যারা কথা বলার মত করেই লিখেনও,তারা বেশ জনপ্রিয়ও, নাদিয়া ইসলাম,শৈলি নাসরিন,মারজুক রাসেলসহ বেশ কয়েকজন, এরমধ্যে আঞ্চলিক ভাষার উপর বইয়ের ভাষা চাপিয়ে দেয়া নিয়ে নিয়মিত একটা প্রতিবাদ গড়ে তোলার কাজ করেণ ফারুক সাদিক ভাই, তার এই প্রতিবাদেও আমি একাত্ব আছি।ভাষা নিয়ে মাস্তানি কোনভাবেই কাম্য নয়, বরং অধিকার ক্ষুণ্ণ করার শামিল।

যাহোক যেটা বলছিলাম, ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদকের এই বলার ভাষা নিয়ে বেশ ট্রল করা হচ্ছে, এটা নিয়ে হাস্যরস করা হচ্ছে, সেটা করছেন আবার বেশ মাপের বুদ্ধিজীবীরাই, ভাষা নিয়ে তার মান যাচাইয়ের কাজও করছেন তারা।এটা একপ্রকার উগ্র ভাষাবাদ,ভাষা মাস্তানি ছাড়া কিছু নয়।

চাকমা ভাষায় বই তৈরি করা হয়েছে এবছর থেকে, আদিবাসীদের ভাষায় বই প্রকাশ করা দাবিও বহুদিনের।
বাঙলাদেশে কথা বলায় আলাদা আলাদা ধরণ আছে। অঞ্চলভেদে সবাই যারযার মত করে কথা বলেন, চট্টগ্রামের মাতৃভাষা একরকম, রংপুরে একরকম, খুলনাতে একরকম,বরিশাল,নোয়াখালীতে আরেকরকম, এরকম প্রত্যেক অঞ্চলেই কথ্যভাষায় একটা ভিন্নতা আছে, সেখানকার সংস্কৃতিতেও একটা ভিন্নতা আছে, তবে বেসিক কিছু সংস্কৃতিতে মিল আছে এই ভূখন্ডের মানুষের মধ্যে, সেই মিলই সকলকে এক পতাকার তলে শামিল করেছে,বাঙালি জাতীয়তাবাদ গড়ে তুলেছে।
তবে, সেটাকে যদি বইয়ের ভাষা চাপিয়ে দিয়ে আঞ্চলিকতাকে প্রেশারাইজ করা হয় সেটা কোনভাবেই ভালো ফল বয়ে আনবেনা।বরং উচিৎ হবে, এসব ভাষার সুষ্ঠু সংরক্ষণ এবং গবেষনা তৈরি করে ভাষাকে উন্মুক্ত চর্চার ব্যবস্থা করা।

সেটা না করে ভাষা নিয়ে যদি মাস্তানি করা হয় সেটা অসন্তোষই বাড়াবে।সবার যারযার মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার নিশ্চিত হোক সেটাই হোক চাওয়া।তার বদলে কেউ মাতৃভাষায় কথা বললে,সেটাকে ব্যাঙ্গ করাটা মাস্তানি।মাস্তানি প্রতিরোধ করার দায়িত্ব সকল ভাষাপ্রেমির।
যে নিজের ভাষাকে ভালোবাসেন, তার অন্যের ভাষার প্রতি সম্মান দেখানোটাই সভ্যতা।সেই সভ্য সমাজ গড়ে উঠুক,সেই প্রত্যাশা।

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন