কুমিল্লায় চিকিৎসা ফির নামে চলছে নৈরাজ্য

কুমিল্লা প্রতিনিধি:

কুমিল্লায় চিকিৎসা ফির নামে চলছে নৈরাজ্য। ডাক্তারদের ফ্রি স্টাইলে গলাকাটা ফি আদায়ে ভূক্তভোগী রোগীদের পক্ষ থেকে অসংখ্য অভিযোগ উঠেছে।

সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কুমিল্লা শহরে আতঙ্কের নামে পরিনত হচ্ছে চিকিৎসা সেবা। সরকারি নীতিমালা না থাকার কারনে ইচ্ছেমতো ব্যবস্থাপত্র ফি নেয়ায় নিম্ন মধ্যম আয়ের ভূক্তভোগী রোগীরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন।

কমিশনের লোভে চিকিৎসকরা অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়ে রোগীদের অর্থের নষ্ট করা ছাড়াও রোগীকে পর্যাপ্ত সময় না দেয়ার মতো অভিযোগ রয়েছে বেশীরভাগ চিকিৎসকের বিরুদ্ধে।

এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, ঔষধ কোম্পানীগুলোর কমশিন প্রলোভনে পড়ে রোগীদের অতিরিক্ত ঔষধ লিখে দেয়া। মেডিকেল বোর্ড থেকে নিয়মিত তদারকি না করার কারণে দিনের পর দিন ডাক্তাররা চিকিৎসার নামে সাধারন মানুষের পকেট কাটার সুযোগ পাচ্ছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, কুমিল্লা মহনগরীসহ জেলার সব কয়টি উপজেলার প্রাইভেট হাসপাতালের চিকিৎসকগণ ১২শ’ টাকা থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন ৬শ’ টাকা পর্যন্ত ফি আদায়ের একই চিত্র। তাছাড়া সরকারি হাসপাতালে আগত রোগীদের ডাক্তারদের ভিজিটিং কার্ড ধরিয়ে দিয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে দেখা করার বা চিকিৎসা নেয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করছে এক শ্রেণীর চিকিৎসক।

এরপর সেখানে গেলে অযথা পরীক্ষা করিয়ে আদায় করা অতিরিক্ত অর্থ। যারা রোগীদের জিম্মি করে টাকা আদায় করছে তাদের রেজিষ্ট্রেশন বাতিল, দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহন, চিকিৎসক ও হাসপাতাল মালিকদের আরো মানবিক হওয়ার প্রয়োজন বলে মনে করেন ভূক্তভোগী অনেক রোগী।

এ বিষয়ে আমির হামযা নামের এক রোগী বলেন, আমি কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বর্হিঃবিভাগে টিকেট করে চিকিৎসা নিতে গেলে ডাঃ সাগর চক্রবর্তী আমাকে তাঁর ভিজিটিং কার্ড দিয়ে নগরীর ঝাউতলা এলাকার জননী ডায়গনষ্টিক সেন্টারে প্রাইভেটভাবে দেখানোর কথা বলে। পরে আমি সেখানে গেলে তিনি ৬শ’ টাকা ফি রাখেন এবং আমাকে দিয়ে ১৮শ’ টাকা মূল্যের অপ্রয়োজনীয় ৩টি পরিক্ষা করান।

একই কায়দায় ডাক্তারের প্রতারণার ফাঁদে পড়া যুবক মুসলিম উদ্দিন কুমেক এর চিকিৎসক মোহাম্মদ শোয়েব বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, আমি দীর্ঘদিন যাবৎ দাঁত ব্যথায় ভুগছি। গত শনিবার সকালে কুমিল্লা সদর হাসপাতালে গিয়ে টিকেট নেওয়ার পর আমাকে ১০ নাম্বার রুমে যেতে বলে। যাওয়ার পর গিয়ে দেখি ওখানে কোন ডাক্তার নেই। প্রায় এক ঘন্টা পর সাড়ে ১০ টায় ছোট একটা বাচ্চা সাথে নিয়ে খেলতে খেলতে ডাক্তার ( ডা: শোয়েব) আসলো।

পরে অনেক্ষণ অপেক্ষার পর ডাক্তারের কাছে গিয়ে আমার সমস্যার কথা বললাম। তারপর উনি (ডাক্তার) বললো যে, সে পার্সনালভাবে আমাকে দেখবে। এখানে সেবা দেওয়ার মতো কোন যন্ত্রপাতি নাই। তিনি আমাকে একটা কার্ড দিয়ে বলেন, সালাউদ্দিনের পাশেই আমি বসি। সেখানে তিনি পার্সনালভাবে রোগী দেখবেন কিাল ৩ টা থেকে ৯ পর্যন্ত। পরে সেখানে গেলে তিনি ৬শ’ টাকা ভিজিট নেন। একই অভিযোগ রয়েছে এ হাসপাতালের প্রায় অর্ধশত ডাক্তারের বিরুদ্ধে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কুমেক এর এক চিকিৎসক বলেন, শিক্ষা এবং চিকিৎসা যদি পণ্য হয়ে যায়, তাহলে তার গুনগত মান থাকে না। দৃষ্টিভঙ্গিতে কেউ লাভবান হয়, কেউ হয় ক্ষতিগ্রস্থ। সাম্যতা, বাস্তবিক অবস্থা ও মানসিকতা থাকেনা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৪ সালে চিকিৎসকদের জন্য একটি নীতিমালা প্রণীত হয়েছিল। ওই নীতিমালায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগন ৬০ টাকা ও সাধারণ এমবিবিএস চিকিৎসক ৪০ টাকা ফি নিতে পারবেন বলে নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এরপর দীর্ঘদিনেও ওই নীতিমালা হালনাগাদ না করায় চিকিৎসকরা ইচ্ছেমতো ফি আদায় করছেন।

এ বিষয়ে কুমিল্লার সিভিল সার্জন ডা. মো. মজিবুর রহমান জানান, সরকারিভাবে কোনো নীতিমালা না থাকায় যে যেভাবে পারছে তাদের ফি বাড়িয়ে নিচ্ছে। এতে রোগীরা হয়রানির শিকার হচ্ছে। কিন্তু চিকিৎসকদের উচিত, একটা নির্ধারিত মাত্রায় ফি নেয়া। এ জন্য সরকারি একটা নীতিমালা খুব জরুরী হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, কোনো কোনো চিকিৎসক অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরামর্শ দিয়ে থাকেন, যা ঠিক নয়। রোগীদের তিনি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কম খরচে পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ সকল প্রকার চিকিৎসা সেবা গ্রহনের পরামর্শ দেন।

ঢাকা, ডিসেম্বর ০৮(সময় বাংলা)/এএইচ

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন