কুলিল্লার কৃতি সন্তান মুক্তিযুদ্ধা ওমর ফারুককে নিয়ে প্রাসঙ্গিক কিছু স্মৃতিকথা

এড. মো সলীমুল্লাহ খান: ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং আমার বড় মামা যোদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা কুমিল্লার কৃতী সন্তান ”ওমর ফারুক” তাকে নিয়ে প্রাসঙ্গিক কিছু স্মৃতিকথা” আল্লাহর অশেষ দয়ায় তিনি এখনো জীবিত আছেন এবং সর্বোচ্চ ভাতাও পান, এই সরকারের দেয়া রেশণও নিয়মিত পাচ্ছেন, উল্লেখ্য যে, প্রথম রেশণ পেয়ে কুমিল্লায় উনার বড় বোন #বুবুর জন্য রেশণের তেল, ডাল, আটা ইত্যাদী নিয়ে আসেন, যা এই প্রজন্মের জন্য খুবই ভালো লাগার বিষয়, অহংকারের বিষয়, গৌরবের বিষয় যা ভাষায় প্রকাশ করার মতোনা, শুধুই উপলব্দির বিষয়,

তিনি ম্যাকানিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স করে ইত্তেফাকের জনাব আনোয়ার হোসেন মঞ্জু সাহেবের ”জেনিথ প্যাকেজিং কোম্পানীতে চাকুরী করে বর্তমানে রিটায়ার্ড পারসন, উনার জন্য দোয়া কামনা করছি, তিনি ঢাকায় মাতুয়াইল কোনা পাড়া নামক স্থানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন, ঢাকায় থাকেন আর কোন ধরনের রাজনীতিতেও এখন বয়সের কারনে সক্রিয় নাই, তাই উনার পরিচিতি কুমিল্লাতে তেমন একটা নাই, উনার সম্পর্কে বর্তমান প্রজন্ম অজ্ঞাত,
কেননা যুদ্ধের পর তিনি জীবন সংগ্রামে নিয়োজিত হন, তবে তিনি একমাত্র মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধে যাওয়ার আগেই একবার গুলি খেয়েছিলেন।

যুদ্ধের শুরুর দিকেই কুমিল্লা সিলেট রোডে হানাদার বাহিনী তাদের নিজেদের প্ল্যানে এক প্লাটুন যাওয়ার সময় দেবিদ্ধার থানার জাফরগঞ্জের নিকট একটি মসজিদে বিরতী নেন, এরই মধ্যে গ্রামবাসীকে সাথে নিয়ে মসজিদের ভিতরেই পুরো প্লাটুনকে আটক করে ফেলেন ততকালীন একাদশ শ্রেণীর ছাত্র ওমর ফারুক এর নেতৃত্বে গ্রামবাসী সহ তখন হানাদারদের মসজিদের ভিতর থেকেই প্রতিরোধের গুলিতে প্রথম একবার আহত হন হবু মুক্তিযোদ্ধা ওমর ফারুক। উনার ডান দিকের শোল্ডার বেদ করে গুলি বেড়িয়ে যায়, যদিও গ্রামবাসী আরো হামলে পড়েন কেননা ততকালীন প্রখ্যাত ময়নাল হোসেন মাষ্টার সাহেবের ছেলেকে গুলি করেছে তার কারনে সাধারণ মানুষ হানাদারদের ঘেরাও করে রাখে একসময় তাদের গুলি শেষ তখন মহিলা পুরুষ মিলে পুরো প্লাটুনকে হত্যা করে প্রতিরোধ গড়ে তুলেন, এমনি সময় তারা শেষ পুজি হিসাবে কয়েকটি গ্রেণেড চার্জ করলে মসজিদ সহ ভেঙ্গে পড়ে, তাই অনেক বৎসর ধরে হলেও এবং মসজিদটি সুন্দর করে নির্মাণ করা হলেও এটার নাম এখনো ভাঙ্দা মসজিদ নামে পরিচিত।

এরপর অসুস্থতা বেশী সময় আটকে রাখতে পারেনি মুক্তিযোদ্ধা ওমর ফারুককে, বাবা স্কুল শিক্ষক ময়নাল হোসেন মাষ্টার উনাকে পায়ে ধরে সালাম করলেন, বাবা বললেন হঠাৎ সালাম কেন, বললেন এমনিতেই মন চাইলো তাই করলাম, এরপর না জানিয়ে বেড়িয়ে পড়লেন হঠাৎ মনে পড়লো বড় বুবুর (বড় আপা/বোন)কথা, তাই কুমিল্লা ছোটরা সরকারী কলোনীতে আসলেন সাথে সম্ভবত মুরাদ নগরের জাহাঙ্গীর সাহেব সহ ১০/১২ জনের গ্রুপ, ৮/৩/৭১ সোমবার বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ এর পরদিন সকাল ৭টার সংবাদের পর পুনঃ প্রচারিত হওয়ার সময় বড় বুবুর একটি ছেলে সন্তান হয়েছিল, পুরো গ্রুপ অনুমান ১ মাস বয়সী ভাগিনাটাকে আদর করতে করতে খাওয়া তাদের জন্য বুবুর তৈরী খাওয়া রেডি, তারপর তারা খেয়ে দেয়ে বড় বুবুকে ও দুলাভাই প্রখ্যাত শিক্ষক আলী আকবর খান স্যারকে সবাই সালাম করে যুদ্ধে যাবার কথা বলে বিদায় চাইলেন, বিদায় বেলা বুবুর চোঁখে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে, দুলাভাই ছিলেন নিরীহ গরীব মাষ্টার, সাহিত্যিক, কবি টাইপ মানুষ, তারপরও তিনি উনার সাধ্যানুযায়ী যৎ সামান্য টাকা পয়সা দিলেন, তারা বিদায় নিয়ে আখাউরা সীমান্ত দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেণিং ক্যাম্পে চলে গেলেন,ট্রেণিংশেষে সেক্টর কমান্ডারের নির্দেশ মেনে চলায় সহকারী কমান্ডার হয়েছিলেন,এরপর সম্মূখ যুদ্ধের সময় আবার গুলিবিদ্ধ হন, এবার অপারেশণ করা লাগলো কিন্তু দুটি স্প্রিন্টার হাড়কে বেদ করে আটকে যায়, অপারেশণ যথাসময়ে না করার কারনে হাড়ের ভিতর থেকে রসালো ”বুনমেরু”বের হয়ে ঢেকে দেয়, তাই এগুলো অপসারন সম্ভব হয়নাই এই গুলি শরীরে নিয়ে এখনো বেচে আছেন।

মুক্তির ধামামা বেজে উঠছিলো, কালো মেঘ সরে গিয়ে স্বাধীনতার লাল সূর্যটা যেন উকিঝুকি মারছিলো, এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর কুমিল্লা মুক্ত অঞ্চল বা স্বাধীন ঘোষণা দেয়া হলো, উনাদের গ্রুপের কিছু মুক্তিযোদ্ধা ঢাকার পথে যাওয়ার জন্য রওনা দিতে বললেন মুক্তিযোদ্ধা ওমর ফারুক সহ কয়েকজন বললেন এ সমস্ত লুটপাট আমাদের দ্বারা হবেনা, আমার বাবা শোনলে আমাকে মেরে ফেলবেন নয়তো নিজেকে মেরে ফেলবেন তাই তোমরা যাও বলে ওমর ফারুক বাড়িতে চলে আসলেন। মানুষের নিকট টাকা, পাওয়ার, দাপট দেখাতে যান নাই, কিন্তু মানুষ এইসব ওমর ফারুকদের ইতিহাসে সঠিক মর্যাদা দিয়েছেন এবং আজীবন থাকবেও বটে। আমি তাদের নাম বলবোনা কারা কারা ঢাকায় লুটপাট করতে সেদিন ঢাকা গিয়ে লুট করেছেন। কিন্তু মানুষের মনে এদের প্রতি কোন শ্রদ্ধাবোধ নেই, তাই দেখা যায় টাকার জোড়ে রেকর্ড করেছেন এমন প্রার্থী আমি সৌজন্যতার খাতিরে নাম বলবোনা, এমনকি কে তা জানাও জরুরীনা, কি রেকর্ড করেছেন।

তিনি এমন ভাগ্যবান প্রার্থী দলীয় মার্কা নৌকা নিয়ে দাড়িয়ে বার বার অর্থাৎ ৪ পাঁচবারই ফেল করার রেকর্ড করেন তারপরও দলীয় নমিনেশণ কিভাবে পান বা কেন দেয়া হয় এর রহস্য সতীর্থ নেতাদেরও জানা নেই আমরা জানবো কেমনে। যাক মান সম্মান ইজ্জতের মালিক আল্লাহ, যে এক মাস বয়সের বড় বুবুর বাচ্চাটি, যাকে মুক্তিযোদ্ধারা আদর করেছিলেন, সেই ভাগিনা বা ছোট্ট বাচ্চাটিই হলাম আজকের আমি, তাই আমি গর্বিত এবং এই যে লেখলাম স্মরণ করলাম এতেই আমার খুবই ভালো লাগে, যা বলে বুঝানো যাবেনা, যা একান্তই অনুভূতির বিষয়, উপলব্দির বিষয়, যা একান্ত আমার নিজের

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন