কেমন আছেন রোহিঙ্গারা?

সাব্বির ইসলাম, নিজস্ব প্রতিনিধিঃ মিয়ানমারের মুসলিম সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত রোহিঙ্গা ইস্যু বহুদিন ধরেই মিয়ানমারের অন্যতম আলোচিত সংকট, যদিও এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে ‘রোহিঙ্গা’ বলতে নারাজ দেশটির সেনাবাহিনী।

গতবছরের ২৫ আগস্ট রাতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে কয়েকটি পুলিশ ফাঁড়ি ও তল্লাশিচৌকিতে সন্ত্রাসী হামলা এই সংকটকে আরও উসকে দেয়। ওই সন্ত্রাসী হামলার জেরে রাখাইন রাজ্যে নতুন করে সেনা অভিযান শুরু হয়, চলে দমন-পীড়ন। মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী নিরস্ত্র রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশুদের ওপর নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে। জাতিসংঘের মানবাধিকার-সংক্রান্ত হাইকমিশনার জাইদ রা’দ আল-হুসেইন এ নিপীড়নকে ‘জাতিগত নির্মূলের এক আদর্শ উদাহরণ’ বলে অভিহিত করেছেন। এসময়ে নির্যাতনের শিকার হয়ে দলে দলে মিয়ানমার ছাড়া শুরু করে রোহিঙ্গারা।

প্রথম কয়েক দিন বাংলাদেশ সীমান্ত বাহিনী বাংলাদেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি করলেও পরে তাদের প্রবেশ করতে দেয়। এর পর থেকেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়।

শুরু হয় সীমান্ত পাড়ি দিয়ে স্রোতের মত রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাংলাদেশে প্রবেশ। নাফ নদী পার হয়ে ছোট ছোট নৌকায় তারা আসতে থাকেন দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা জুরে। হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান জনগোষ্ঠী আশ্রয় নেয় বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্বের জেলা কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলায়। তার মধ্যে টেকনাফ এবং উখিয়া অন্যতম।

সেসময় রাখাইনে নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের দুঃখ-দুর্দশা ও বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে কক্সবাজারের উখিয়ায় যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তিনি শরনার্থী হিসেবে রোহিঙ্গাদের সকল সেবা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেন।

সেসময় বিভীন্ন এনজিও, ব্যাক্তি উদ্যেগসহ দেশি বিদেশী নানা সংস্থা নানাভাবে রোহিঙ্গাদের পূনর্বাসনে এগিয়ে আসে, নানাজন থেকে ত্রাণ সামগ্রী পেয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম শুরু করেন রোহিঙ্গারা।

স্বজন-পরিজন, বাস্তুভিটা, সহায় সম্বল হারানোর, শোক কাটিয়ে বেঁচে থাকার অবিরাম চেষ্টায়, সরকার, বিভিন্ন সংস্থা ও মানুষের দেয়া ত্রাণ দিয়ে ক্ষুধা নিবারণ, দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে নেয়ার চেষ্টা শুরু করেন তারা, থাকার জন্যে পাহাড় কেটে তৈরি করা হয় অসংখ্য অস্থায়ী ক্যাম্প।

রোহিঙ্গাদের ভারে কক্সবাজারের পথঘাট জনবহুল হয়ে পড়ে, ত্রান ব্যাবস্থাপনায় জটিলতা নিরসন এবং রোহিঙ্গা পূনর্বাসনে মোতায়েন করা হয় সেনাবাহিনীর টীম।
বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের কাজ শুরু করা হয়।

জেলা পুলিশ সুপার ড. একেএম ইকবাল হোসেন বলেন, উখিয়ার ৭১ কিলোমিটার জুড়ে বসানো হয়েছে ১১টি চেকপোস্ট। ২২টি মোবাইল টিম কাজ করছে।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের এখানে কাজের সুযোগ না থাকলেও অসংখ্য মানুষ, সরকারি সংস্থা, রাজনৈতিক দল ও দাতা সংস্থা রোহিঙ্গাদের জন্য খাবার দাবার, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য, গৃহস্থালী আসবাব, নলকূপ, লেট্টিনসহ জীবন ধারণের যাবতীয় উপাদানের আপাত যোগান দিচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে কি হয়, সেটা না ভেবে আপাতত কিভাবে কিছুটা ভালোভাবে বেঁচে থাকা যায় তা নিয়েই ব্যস্ত।

থ্যাইংখালীর শিবিরে চার সন্তানকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন খাদিজা বেগম। স্বামীকে হারিয়েছেন মংডুতে। দুই সন্তান এখনো ছোটো, বড় দুইজনের একজনের বয়স ৯, অন্যজনের বয়স ১১।

তিনি বলেন, একটি সংস্থা তাদের একটি ত্রিপল দিয়েছে, আরো টুকটাক সামগ্রী পেয়েছেন। সেনাবাহীনি খাবার দিচ্ছে। সকালে বড় দুই ছেলে রাস্তায় গেছে কাজের সন্ধানে। কেউ যদি কিছু দেয় সে আশায়।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন জানান, শরণার্থীদের জন্য স্যানেটারি ল্যাট্টিন, নলকূপ ও শেড : রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য ১ হাজার ২০০ স্যানিটারি ল্যাট্টিন ও ১ হাজার ২০০টি নলকূপ বসানো হয়েছে।

তিনি বলেন, গতবছর রোহিঙ্গাদের ঢলে প্রায় ৪ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। এ সকল আশ্রয় প্রার্থীরা উখিয়া ও টেকনাফের ১২টি আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছে।

অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে রোহিঙ্গারাঃ

আশ্রিত রোহিঙ্গারা দিন দিন অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠছে। রোহিঙ্গাদের হামলার শিকার হচ্ছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ থেকে পুলিশ, এনজিও কর্মকর্তা ও ত্রাণ সহায়তা দিতে আসা লোকজন। আবার একটি অংশ জড়িয়ে পড়েছে ইয়াবা, মানব পাচারের মতো জঘন্য অপরাধ কর্মের সঙ্গেও। ক্যাম্পে তাদের নিজেদের মধ্যেও বাড়ছে ঝগড়া-বিবাদ। এ পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের হামলার শিকারে প্রাণ হারিয়েছেন ৬জন। আর বিভিন্ন সময় আহত হয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তাসহ বেশ কয়েকজন।

সময়বাংল/আইসা

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন

এ বিভাগের আরো খবর