কোটা সংস্কার আন্দোলন ও ছাত্রলীগের ‘ডিগবাজি’

????????-rtvonline

সময় বাংলা ডেস্ক:

সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে তীব্র আন্দোলনের মুখে অবশেষে সুর নরম করতে বাধ্য হয় সরকার। টানা কয়েকদিনের এই আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীরা তাদের অবস্থানে অনড় থেকেছেন। পুলিশের লাঠিপেটা, প্রধানমন্ত্রীর হুঙ্কার, মন্ত্রীদের লাগামহীন গালিগালাজ কিংবা সরকারের পেটোয়া ছাত্রলীগ কেউই কোনোভাবে তাদেরকে দাবী থেকে একচুল নড়াতে পারেনি। তাদের শক্ত অবস্থানের কারণেই ভেস্তে যায় সচিবালয়ে ডেকে নিয়ে মিথ্যা আশ্বাসের নাটক।

এই কয়েকদিনের আন্দোলনের পুরোটা সময় ঢাবি ক্যাম্পাস সহ দেশের সর্বত্রই ছাত্রলীগকে দেখা গেছে বিপক্ষ অবস্থানে। দিনের বেলায় সোহাগ-জাকিরের নেতৃত্বে ক্যাম্পাসে মিছিল এবং রাতের বেলায় হাইকমান্ডের নির্দেশে ছাত্রলীগে সন্ত্রাসীদের হলে হলে গিয়ে আন্দোলনকারীদের মারধর ছিল এই কয়েকদিনে ছাত্রলীগের অবস্থান। কিন্তু, এই আন্দোলন যখন ক্রমশই তীব্র আকার ধারণ করছিল তখন হঠাৎ করেই বুধবার ডিগবাজি খেয়ে নিজেদের অবস্থান ঘুরিয়ে নেয় ছাত্রলীগ। এদিন প্রথমে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক এস.এম জাকির হোসাইন ফেসবুকে দেয়া একটি স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেন- ‘সরকারি চাকরিতে কোনো কোটা থাকছে না।’ স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর বরাত দিয়ে এমন স্ট্যাটাস দেন তিনি।

এর কিছুক্ষণ পরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে এক সংবাদ সম্মেলনেও একই ঘোষণা দেয় ছাত্রলীগ। সোহাগ, জাকির সহ তখন সেখানে উপস্থিত ছিল সংগঠনটির কেন্দ্রীয় ও শাখা কমিটির নেতাকর্মীরা। সেখানে ছাত্রলীগ সভাপতি সোহাগ বলেন, অনেক দিন ধরে আমরা যৌক্তিক আন্দোলন দেখতে পারছি। কোটা সংস্কারের সঙ্গে আমরা সহমত। প্রধানমন্ত্রী বলেন কোটা ছিল ছাত্রদের জন্য তারা যদি না চায় তাহলে কোটা থাকবে না। চাকরি হবে মেধাবীদের। আগে থেকে আমরা (ছাত্রলীগ) আন্দোলনে ছিলাম। এখনো আছি। আমরা আগে ছাত্র পরে লীগ।

এসময় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ছিলেন। কোটা নিয়ে আন্দোলনকারী ছাত্রদের ২০ দলের প্রতিনিধি দলের সমন্বয় করেছিলো ছাত্রলীগ। ঢাবির ভিসির বাড়িতে যারা ভাংচুর করেছেন তাদের বিচার চেয়েছি। আন্দোলনকারীদের বিচার চাইনি।

জাকির বলেন, আমরা ছাত্রদের সঙ্গে আগেও ছিলাম, এখনো আছি। আমরা ছাত্র সমাজ নিয়ে কাজ করি।

অথচ, গত ৯ এপ্রিল কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেছে ছাত্রলীগ। সেদিন ভোর ৬টার দিকে শাহবাগ থেকে শুরু হয়ে মিছিলটি কার্জন হলের দিকে যায়। মিছিলে থাকা ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের হাতে লাঠি, রডসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র দেখা গেছে ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইনসহ প্রায় তিনশ নেতাকর্মী ছিলেন সেই মিছিলে। (বাংলা ট্রিবিউন)

কোটা সংস্কার আন্দোলনের বিরুদ্ধে সোহাগ-জাকিরের নেতৃত্বে ঢাবি ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের মিছিল

৯ এপ্রিল ভোর ৬টার দিকে ছাত্রলীগের মিছিলটি শহীদুল্লাহ হলের সামনে পৌঁছালে সেখানে অবস্থানরত আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আবারও থেমে থেমে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে।

১০ এপ্রিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের বিক্ষোভ কর্মসূচি বাদ দিয়ে ক্লাসে যাওয়ার জন্য বলেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ। তিনি বলেছেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনে সরকার এক মাস সময় নিয়েছে। যারা এখন আন্দোলন করছেন, তারা পড়ার টেবিলে যান, ক্লাস-পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। (এনটিভি অনলাইন)

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের বিক্ষোভ কর্মসূচি বাদ দিয়ে ক্লাসে যাওয়ার আহ্বান জানান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ। ছবি: স্টার মেইল

১১ এপ্রিল গভীর রাতে ক‌বি সু‌ফিয়া কামাল হ‌লে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী‌ এক ছাত্রীকে মারধর করে পায়ের রগ কেটে দেয় বেগম সুফিয়া কামল হলের ছাত্রলীগ সভাপতি ইশরাত জাহান এশা।

ওই ছাত্রী‌কে মারধ‌রের প্র‌তিবা‌দে শত শত কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী হলের সামনে জড়ো হয় এবং সাধারণ ছাত্রীরা হ‌লের ভেত‌রে বি‌ক্ষোভ শুরু করে। আশেপাশের সব হল থেকে শিক্ষার্থীরা বের হয়ে এসে বিক্ষোভে যোগ দেয়। তারা হামলাকারী এশার শাস্তি দাবি করে।

ক্ষুর দিয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীর রগ কেটে দেয়া ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী এশা

পরিস্থিতি সামাল দিতে তাৎক্ষণিক ক্ষমা চেয়েও রক্ষা পায়নি ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী এশা।

বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের থামাতে তখনই তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয় ঢাবি কর্তৃপক্ষ। পরে তাকে সংগঠন থেকেও বহিষ্কার করে ছাত্রলীগ।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত এমন সংবাদ ছাড়াও এই কয়েকদিনে ফেসবুক, ইউটিউব সহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের নির্যাতনের অসংখ্য ছবি, ভিডিও এবং পোস্ট।

সেখানে তুলে ধরা হয় কীভাবে ছাত্রলীগ হলে হলে তাণ্ডব চালিয়েছে, কীভাবে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা আন্দোলনকারীদের মারধর করেছে, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের রামদা নিয়ে প্রকাশ্যে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ার চিত্রও সামনে এসেছে ফেসবুকের কল্যাণে। ১০ এপ্রিল গভীর রাতে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইলে আপলোড করা ভিডিওতেও দেখা যায় ঢাবি ক্যাম্পাস এলাকায় আন্দোলনরতদের ওপর ছাত্রলীগের চড়াও হওয়ার দৃশ্য।

অথচ, এই ছাত্রলীগ দাবি করছে ‘আন্দোলনে পাশে থাকার।’ যা শুধু মিথ্যাচারই নয়, আন্দোলনকারীদের অপমান করারও শামিল।

এসএস

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন