খাদ্যমন্ত্রীর প্রশ্ন জজ সাহেব কি রায়টা গাঞ্জা খাইয়া দিছে

kamrulসময় বাংলা ডেস্ক : স্ববিরোধী কথা বলেও নিজেকে সঠিক মনে করছেন খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম। তার দাবি তিনি বিচারাধীন বিষয় নিয়ে কথা বলেননি। পরক্ষণেই বিচারাধীন বিষয় নিয়ে তার করা মন্তব্যের ব্যাখ্যাও দেন তিনি, যিনি একজন অ্যাডভোকেট।

‘আমি কিন্তু বিচারাধীন বিষয় নিয়ে কথা বলিনি,’ বলেন তিনি।

পরক্ষণেই কামরুল বলেন, ‘আমি কেন মন্তব্য করেছি তার ব্যাখ্যা দিয়েছি’।

এমনকি বিচারক গাঁজা খেয়ে রায় দিয়েছেন কিনা সেই প্রশ্নও তুলেছেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এ মন্ত্রী।

কামরুল ইসলাম বলেন, ‘দোয়া করি, প্রত্যাশা করি এখনও রায়টা ঠিক হোক। মীর কাশেম আলীকে ছাইড়া দিলে কলিজাটা ফাইটা যাইব।’

প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে মীর কাশেম আলীর মামলা ফের বিচারের দাবিকারী এই মন্ত্রী আদালত অবমাননা করেননি বলেও মনে করেন।

খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকার পরও তার দাবি, বিচারাধীন মামলাটির বিষয়ে করা মন্তব্যটি তিনি মন্ত্রী হিসেবে করেননি। জনমনে সংশয় দূর করার জন্য এই মন্তব্য করেছেন।

ইসলামী ছাত্র শিবিরের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জামায়াতের আর্থিক খুঁটি ও দলটির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে পরিচিত মীর কাশেম আলী। ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় ৮ মার্চ ঘোষণার তারিখ দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিন্‌হার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের এক নম্বর বেঞ্চ। ট্রাইব্যুনালে তার মৃত্যুদণ্ড ও ৪২ বছরের জেল হয়েছে।

প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আদালতে মীর কাশেমের মামলার বিষয়ে বিচারক এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের কথপোকথন ছেপে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদক প্রকাশ করে একটি দৈনিক পত্রিকা। এরপর গত শনিবার একটি অনুষ্ঠানে (৫ মার্চ) খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক আদালত এবং বিচারাধীন মামলার বিষয়ে ‘নজিরবিহীন’ মন্তব্য করেন।

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বিচারাধীন বিষয় নিয়ে মন্ত্রীর বক্তব্য অসাংবিধানিক বলে মন্তব্য করেন। আইনমন্ত্রী থেকে শুরু অনেক আইনজীবি বিচারাধীন বিষয় নিয়ে মন্তব্য করা সমুচিত নয় বলে মত দিয়েছেন।

তারই পরিপ্রেক্ষিতে ৬ মার্চ দুপুরে সচিবালয়ে কথা হয় খাদ্যমন্ত্রীর সঙ্গে।

কামরুল ইসলাম বলেন, বিচারাধীন বিষয়ে মন্তব্য করা যায় না। অ্যাটর্নি জেনারেলসহ অন্য বিজ্ঞ আইনজীবিরা যেমন বুঝেন একজন আইনজীবি হিসেবে আমিও বুঝি।

‘কিন্তু হাইকোর্ট বিভাগের তিনজন জজের নেতৃত্বে ট্রাইবুনালে মামলাটার বিচার হয়েছে। প্রসিকিউটররা প্রমাণ করতে পেরেছে বলেই তো শাস্তি হয়েছে আসামির। আমি যখন দেখি প্রকাশ্য আদালতে সেই প্রসিকিউটরদের বিরুদ্ধে একেবারে ধুয়ে ফেলছে .. .।’

‘আদালত এক পর্যায়ে … আদালত এমন কথাও বলছে যে, প্রসিকিউটররা মামলার নামে রাজনীতি করছে। যেটা মীর কাশেম আলীর লবিস্ট টবি ক্যাডম্যান বলে। বিএনপি-জামায়াতসহ আন্তর্জাতিক চক্র এসব কথা বলে বিচারকে বাধাগ্রস্থ করতে চায়। তখন কি আমি সংক্ষুব্ধ হব না, উদ্বিগ্ন হব না, তখন কি আমার রি-অ্যাকশন থাকবে না?’ এভাবেই নিজের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করান মন্ত্রী।

আপনি তো সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী, এর আগে আইন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বোপরি একজন আইনজীবিও। আপনার এমন মন্তব্য বিচারকে কি প্রভাবিত করবে না?

জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি তো মানুষ, আমি মন্ত্রী কি আকাশের জ্বীন? নাকি অন্য গ্রহের জ্বীন? আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমি এই মামলার বাদী। ষোল কোটি মানুষ এই মামলার বাদী। জনমনে সংশয় দূর করা জন্য আমি এটি বলেছি।’

প্রধান বিচারপতি আদালতে মন্তব্য করেছেন।তার মন্তব্যের বিষয়ে আপত্তি থাকলে গণমাধ্যমে কথা না বলে আদালতের মাধ্যমেই সমাধান চাওয়া সমুচিত বলে বিজ্ঞ আইনজীবিরা বলছেন- খাদ্যমন্ত্রীকে এমন বলা হলে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, ‘এইটা কোথায় আছে?’

‘আমিও তো বিচারাধীন বিষয়ে মন্তব্য করিনি। বিচারাধীন বিষয় নিয়ে মন্তব্য করাটা সমীচীন নয় এটা আমি আগেই বলেছি। কিন্তু, কেন মন্তব্য করেছি সেটাও বলেছি।এখন বুঝে নাও,’ ব্যাখ্যা দেন খাদ্যমন্ত্রী।

সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি হিসেবে আদালতে যাবেন কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে কামরুল বলেন, ‘রায় যদি আশানুরুপ না হয় তাহলে আপিলে আদালতে যাইতেই পারি।’

কিন্তু আপনি তো রায়ের আগেই মন্তব্য করলেন—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে কামরুল বলেন, ‘কেন মন্তব্য করেছি সেটা এতক্ষণ পর্যন্ত বললাম। সাতখণ্ড রামায়ন পড়ে সীতা কার বাপ বললে তো হবে না। মামলার শুনানিকালে (বিচারকরা) এত কথা বলবেন কেন? এত কথা বইলা তারা আমাকে হার্ট করছেন কেন?’

‘আজকে বিচারাধীন মামলা নিয়ে বিএনপির রিজভী এবং অ্যাটর্নি জেনারেল একই ভাষায় কথা বলছেন। জামায়াত-বিএনপি যেখানে বিচার নিয়ে রাজনীতি হচ্ছে মন্তব্য করছে, সেই জায়গায় আদালতও যদি বলে প্রসিকিউটররা রাজনীতি করছে, তাহলে তো একই ভাষায় কথা বলা হচ্ছে। এদেরকে তো আমরা সরকার নিয়োগ দিয়েছি। তাহলে রাষ্ট্র বা সরকার কি বিচার নিয়ে রাজনীতি করছে?’ প্রশ্ন রাখেন সাবেক এই আইন প্রতিমন্ত্রী।

প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে মামলার আপিল শুনানির দাবি কতটা যৌক্তিক? প্রধান বিচারপতি নিজেই তো আদালত – সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে কামরুল তার কথার ভুল ব্যখ্যা দেওয়া হয়েছে দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘(উচ্চ) আদালত চাইলে চলমান মামলা আবার শুনানির জন্য উইথড্র করে নিয়ে আসতে পারে। প্রয়োজনে ভিন্ন বেঞ্চে শুনানির ব্যবস্থা করতে পারে। আমি তো এই ব্যাখ্যাটাই দিয়েছি।’

বিজ্ঞ আইনজীবিদের মতের প্রসঙ্গে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, ‘অনেক আইনজীবিদের বক্তব্য শুনেছি। আসলে তারা সুপ্রিম কোর্টে যেহেতু প্র্যাকটিস করেন তাদের অনেক স্বার্থ জড়িত, (তাদেরকে) আদালত সন্তুষ্ট রেখেই কথাবার্তা বলতে হয়।’

রাষ্ট্রের সবোর্চ্চ আইন কর্মকর্তার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘উনি(অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম) তো সিভিল মামলা ছাড়া ক্রিমিনাল মামলা জীবনে করে নাই। যাই হোক অ্যাটর্নি জেনারেল বিরাট ল’ইয়ার। কিন্তু এই সমস্ত কথাবার্তা, গালাগালি, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, তাদের (প্রসিকিউটরদের) প্রতি অবজ্ঞা করা হয়েছে।’

ট্রাইবুনালে দায়িত্বপালনকারী প্রসিকিউটরদের আপিল শুনানীতেও নেওয়ার পক্ষপাতী সাবেক এই আইন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘তাদের ওইখানে নিতে পারত, তাদেরকে নেয় নাই অ্যাটর্নি জেনারেল, নেয় নাই কেন? সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা তিনি তো কোনো সুযোগই দেন না। তিনি সবই করবেন।’

খাদ্যমন্ত্রী বলেন, ‘চিন্তা করে দেখ, তাদের (অ্যাটর্নি জেনারেল ও আদালত) ভাষায় এই ভাঙ্গাচোরা প্রসিকিউশন দিয়েই তো ২২টা মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, নাকি। এই সিন্‌হা বাবুই তো আপিল বিভাগে মামলা শুনছেন। তাদের তুমি এত গালাগালি কেন করবা? (ট্রাইবুনালের) জজ সাহেব যে রায়টা দিছে তাহলে জজ সাহেব গাঞ্জা খাইয়া রায়টা দিছে? আর না হয় জজ সাহেব প্রভাবিত হয়ে দিছে। ৪২ বছর সাজা নট এ ম্যাটার অব জোক।’

‘আজকে মীর কাশেম আলী যখন পয়সাওয়ালা মাথা তখন ওরা (প্রসিকিউটররা) হয়ে গেছে খারাপ। আর এরা করে রাজনীতি এইগুলা কোনো কথা হইল,’ বলেন তিনি।

মীর কাশেম কারাগারে থাকলেও তার পয়সা-কড়ি বাইরে ঘুরছে বলে মন্তব্য করেছেন। এই কথার অর্থ কি? এমন প্রশ্নের জবাবে কামরুল বলেন, ‘এই কথার অর্থ ব্যাখ্যা করতে হয় না। ইশারাতেই কাফি।’

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন