খালেদা জিয়া’র মতো পরিবারের সঙ্গ ছাড়া রিজভীরও ১৩৬ দিন!

সময়বাংলা, ঢাকা: প্রস্থ আড়াই ফুট, দৈর্ঘ্য ৪ ফুট আট ইঞ্চি! এটি একটি খাটের বর্ণনা। তার ওপর রয়েছে একটি বালিশ ও একটি কোল বালিশ। আর খাটের চারপাশে অসংখ্য বই। পেছনে একটি হ্যাংগারে ঝুলে আছে কিছু কাপড়-চোপড়। ঘুরছে একটি টেবিল পাখা। কক্ষটির সাইজ দৈর্ঘ্য ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি, প্রস্থ ৩ ফুট ৫ ইঞ্চি। নেই কোন বিলাসিতা!

এমন একটি কক্ষেই পরিবার ছাড়া ১৩৬ দিন একটি দলের নীতি নির্ধারক। তিনি রুহুল কবির রিজভী। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব। এর আগে ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাকসুর ভিপি। তখন স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে রাজশাহী রেলস্টেশনে গুলিবিদ্ধও হন এই নেতা। তখন থেকেই খাবারসহ নানান শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। তাছাড়া ৩৫ দিনের রিমান্ডের ঘটনাও ঘটেছে এই নেতার জীবনে। ছিলেন ছাত্রদলের নির্বাচিত সভাপতি।

বগুড়ায় জন্ম নেয়া এই রাজনৈতিক ব্যক্তিটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষে টানা ২১ বছর ঢাকায় বসবাস করছেন। গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর থেকে পরিবারের সঙ্গ ছাড়াই নয়াপটনের দলের কার্যালয়ে দিন কাটাচ্ছেন তিনি। আবদ্ধ কক্ষে কীভাবে তিনি দীর্ঘ সময় পার করছেন এবং থাকছেন এ নিয়ে সময়বাংলার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি।

চাপাপড়া দীর্ঘশ্বাসে নিঃসঙ্গতার নিগুঢ় ধ্বনিতে তা উঠে আসে। চাপা কণ্ঠে বললেনও বটে, ঘরে নতুন পর্দা, নতুন চাদরের গন্ধ, ঘরে ফুলের বাহার তাকে এবার স্পষ্ট করবে না। প্রিয় নেত্রী মুক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি পল্টন অফিসেই থাকবেন। ঈদও করবেন এখানে। হাহাকার করা চাঁদের আলোতে নিজেকে খুঁজে নেয়ার চেষ্টা করবেন। বললেন, প্রতিটা মুহূর্ত কাটছে তার পরিবারের জীবন্ত আর্তনাদ শুনে।

যখন বলছেন, কোন মানুষটা চায় না তার পরিবারের সাথে ইফতার করতে! কোন মানুষটা চায় না তার পরিবারের সাথে সেহরী খেতে। রমজানতো মুসলমানের জন্য একটা আনন্দ। কিন্তু এই ভাগ্য! এই আন্দন্দ আমার জোটেনি। ততক্ষণে নেতার চোখের কোণে অশ্রু জমাট বেঁধেছে! মনে হচ্ছে জীবনের চকচকে মোড়কে বেঁচে থাকাটাই এই নেতার বড্ড উপদ্রব। ঋতুর প্লাবন নষ্ট সময়-অসময়। গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় কারাগারে যান খালেদা জিয়া। এরপর থেকেই দলীয় কার্যালয়ে নিজেকে উৎসর্গ করেন দলের এই নীতিনির্ধারক।

প্রতিদিনই একাধিকবার সংবাদ ব্রিফিং করে দলের অবস্থা জানিয়ে যাচ্ছেন। তুলে ধরছেন ক্ষমতাসীন সরকারের সাম্প্রতিক ইস্যুও। করা হচ্ছে আপত্তিকর চলমান ঘটনার প্রতিবাদ। পল্টন অফিসের সূত্রে জানা যায়, বিএনপি চেয়ারপারসন গ্রেপ্তার হওয়ারও ১১ দিন আগে অর্থাৎ গত ২৮ জানুয়ারি থেকে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবস্থান করছেন তিনি। খালেদা আটক হবেন। দলে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হবে, হয়তো দলের কিছু নীতিনির্ধারক আগ থেকেই জানতেন। তাই রেখেছিলেন পূর্ব প্রস্তুতি।

গত শুক্রবার দুপুর ১২টায় সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় দিয়েছিলেন রুহুল কবির রিজভী। সেই আলোকে যথাসময়ে উপস্থিত। কিন্তু তখনো সময় মিলছে না। বিএনপি নেতা খায়রুল কবির খোকনসহ বেশ কয়েকজন নেতাকে নিয়ে তার শয়ান কক্ষে বৈঠক করছেন।

‘স্লিপ’ পাঠানোর পর ১০ মিনিট অপেক্ষা করতে বললেন। মিনিট দশেক পর তিনি তার কক্ষ থেকে লুঙ্গি পড়ে বের হলেন। গায়ে ছিলো হলুদ রঙের একটি শার্ট। মুখ দেখিয়ে বললেন, আসছি ওয়াশরুমে যাচ্ছি। মিনিট সাতেক ওয়াশরুম থেকে বের হলে আমাকে তার রুমে ডাকলেন। সাদামাটা কক্ষটিতে হ্যাঙ্গারে কিছু কাপড়, খাটে বেশকিছু বই ছাড়া তেমন আর কিছু ছোখে পড়েনি।

রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও তার দিনযাপন নিয়ে প্রায় ৩৯ মিনিট চলে আলাপচারিতা। জানিয়েছেন প্রতিদিনের কর্মযজ্ঞের কথা। চেষ্টা করেন ভোরেই ঘুম থেকে উঠতে। এরপর সম্মেলন কক্ষে ৪৫ মিনিট হাঁটাহাঁটি করেন। কিছুক্ষণ পর ফ্রেশ হয়ে সকালের নাশতা করেন তিনি। এরপর রাতে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত দিনের সময় পার হয় দলীয় কর্মকাণ্ডে।

এছাড়াও বড় একটি সময় পার হয় উপন্যাস আর রাজনৈতিক বই পড়ে। খাওয়া দাওয়ায় নেই তেমন বড় চাহিদা। কার্যালয়ের স্টাফদের জন্য যে রান্না হয় তাতেই সারিয়ে নেন খাবারের পর্বটা। তবে মাঝে মধ্যে পরিবার ও নেতাকর্মীরাও কিছু খাবার নিয়ে আসেন। এই সময়টুকুতে স্ত্রী আঞ্জুমান আরা আইভী ও পরিবারের অন্য সদস্যদের খুবই মিস করেন বলেও জানান তিনি। যাদের সাথে এক টেবিলে খাওয়া হয় না বহুদিন।

সময়বাংলা/আইসা

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন

এ বিভাগের আরো খবর