জাতীয় শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠার প্রাণ পুরুষ ডা. গোলাম মাওলাকে ইতিহাসে সঠিক স্থান করে দিতে হবে

ইসমাইল হেসেন স্বপন, সময় বাংলা, ইতালী: পৃথিবীর কোন দেশেই মায়ের ভাষায় কথা বলার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে তা জানা যায়না, জীবন দিতে হয়েছে এমন প্রমাণও পাওয়া যাবেনা। বাঙ্গালী জন্ম থেকেই সংগ্রামী, ত্যাগী জাতি হিসেবে পরিচিত। এ জাতি যখনই যা কিছু অর্জন করেছে তার পেছনে বিসর্জন দিতে হয়েছে অজস্র প্রান। তেমনি তার মুখের ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করতেও মুখোমুখি হতে হয়েছিল রক্ত ঝরানো সংগ্রামের। বাঙ্গালীর মায়ের ভাষা, রাষ্ট্র ভাষা বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করতে যে একটি সুদীর্ঘ আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল সে ইতিহাস সকলের জানা। কিন্তু একটি পরাক্রমশালী দানবচক্রের হাত থেকে আমার জন্মগত অধিকার মুখের ভাষাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিতে যারা প্রাণ দিয়েছে তারা অবিনশ্বর। আর যারা ধারাবাহিক এ সংগ্রামকে অধিকার আদায়ের শেষ স্তম্ভে পৌছে দিয়েছিল তাদের অনেককেই আমরা মনে রাখিনি। ইতিহাস দেয়নি তাদের সঠিক মর্যাদা। আজ আমি এমন একজন ইস্পাত কঠিন দৃঢ় মানসিকতার পরিচায়ক, অকালে ঝরে যাওয়া একজন মহান পুরুষের কথা বলবো যিনি একাধারে ভাষা সংগ্রামী, প্রখ্যাত চিকিৎসক, রাজনীতিক, সমাজসেবক ও বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের অগ্নিপুরুষ ছিলেন। তিনি ভাষা আন্দোলনের প্রাণ পুরুষ ডাক্তার গোলাম মাওলা।

মহান ভাষা আন্দোলন ও আমাদের বাঙ্গালীর ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রথম প্রতীক জাতীয় শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রাণপুরুষ ভাষা সৈনিক ডাক্তার গোলাম মাওলা ছিলেন শরীয়তপুরের সন্তান। রাষ্ট্রভাষা বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করা এবং বাঙ্গালীর চির ঐতিহ্যের ঠিকানা জাতীয় শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ডা. গোলাম মাওলার নেতৃত্ব প্রদান, ভূমিকা ও ত্যাগের তথ্য মাতৃভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে কতটুকুন ঠাঁই পেয়েছে তা আমার জানা নেই। নতুন প্রজন্ম এই ক্ষনজন্মা মানুষটির কীর্তির কথা খুব একটা জানে বলেও আমার মনে হয়না। জাতির সামনে প্রয়াত এই মহান পুরুষের গৌরবান্বিত ঐতিহাসিক অর্জনের সুবিস্তার স্থান পায়নি কোথাও । দীর্ঘ দিন ভাষা সংগ্রামের এই প্রান পুরুষটি রাষ্ট্র থেকে শুরু করে তার নিজের সমাজ সর্বত্রই উপেক্ষিত ছিল।

১৯২০ সালের ২০ অক্টোবর শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া থানার মোক্তারেরচর ইউনিয়নের পোড়াগাছা গ্রামে ঐতিহ্যবাহী একটি মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন গোলাম মাওলা। তার পিতার নাম আব্দুল গফুর ঢালী এবং মায়ের নাম ছিল জমিলা খাতুন। গোলাম মাওলার পিতা ইউনিয়ন বোর্ডর প্রেসিডেন্ট ছিলেন। জাজিরা থানার পাঁচুখার কান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ৫ম শ্রেণী পাশ করে গোলাম মাওলা নড়িয়া বিহারী লাল উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন। ১৯৩৯ সালে সেখান থেকে তিনি বিজ্ঞান বিভাগে কৃতিত্বের সাথে মেট্রিক পাশ করেন। ৪১ ও ৪৩ সালে তিনি ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে আইএসসি ও বিএসসি পাশ করেন। এরপরে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভ’-তত্ব বিষয়ে এমএসসি পাশ করার পর ১৯৪৫ সালে কোলকাতা মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস ডাক্তারী কোর্সে ভর্তি হন। সে বছর মাত্র দুইজন মুসলিম বাংগালী ছাত্র কোলকাতায় এমএসসি পাশ করার পর এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হয় । একজন গোলাম মাওলা অপর জন মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ। কলকাতায় ছাত্রাবস্থাতেই ডা. মাওলার সাথে সখ্যতা হয় বঙ্গবন্ধুর।

গোলাম মাওলা যখন ঢাকা জগন্নাথ কলেজের ছাত্র তখন বৃটিশ শাসনের নাগপাশ থেকে মুক্ত হবার জন্য শৃংখলিত মানুষের আর্তনাদ তাকে ব্যথিত করতো। বিপ্লবী চেতনা থেকেই তিনি বৃটিশ বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন। ভারতে লেখা পড়ার সুযোগে তিনি মুকুল ফৌজের অধিনায়ক হিসেবে বৃটিশ তাড়ানোর আন্দোলনে অগ্রনী ভূমিকা পালন করেন। ৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর কলকাতা থেকে মাওলা ঢাকা মেডিকেল কলেজে চলে আসেন। ৪৮ সাল থেকেই মাওলাসহ কয়েকজন ছাত্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র ইউনিয়ন (ছাত্র সংসদ) প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালান। ৪৮ সালে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ গঠন করা হলে গোলাম মাওলা ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ সভাপতি মনোনিত হন। ১৯৫০ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয় এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে হাতে গোনা কয়েকজন ছাত্রনেতা রাজপথে শান্তি মিছিল বের করেছিল। এদের মধ্যে গোলাম মাওলা অন্যতম ছিলেন বলে ভাষা সৈনিক গাজিউল হক তার একটি স্মৃতি চারণ মূলক লেখায় ১৯৮৪ সালে উল্লেখ করেছিলেন। একই বছর ১৯৫০ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদ গঠন হলে প্রথম ভিপি নির্বাচিত হন ডা. নাজির আহমেদ (তিনি সেনা বাহিনীতে চাকুরী নিয়ে পাকিস্তান চলে গেলে আর কখনো ফিরে আসেননি)। ঢাকা মেডিকেলের ২য় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে মাওলা ৫২’র জানুয়ারিতে ভিপি নির্বাচিত হন গোলাম মাওলা।

১৯৫২ সালের মহান ভাষা অন্দোলনে যে ক’জন তৎকালিন ছাত্রনেতা অসীম সাহসিকতা, সুচিন্তিত মতামত, দক্ষতা এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহনের মাধ্যমে মাতৃভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করার

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন