তুমি জন্মেছিলে তাই বাংলাদেশ একজন বঙ্গবন্ধু পেয়েছে

ড. কাজী এরতেজা হাসান:
একজন মানুষ কিভাবে একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে। সেই প্রতিষ্ঠান কিভাবে একটি আন্দোলনে পরিণত হয়, পরিণত হয় বিপ্লব আর অভ্যুত্থানে। একটি মানুষের কিভাবে হাজার বছরের ইাতিহাসের গতি পাল্টে দিয়ে নিজেই হয়ে উঠতে পারে ইতিহাস তার বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙ্গালী জাতি এই মহান মানুষকে স্বীকৃতি দিয়েছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী হিসেবে। মহান এই বাঙ্গালীকে নিয়ে যত গবেষণা হবে তত বেরিয়ে আসবে অজানা আর নতুন নতুন তথ্য। সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আগত ভবিষ্যত মহান এই নেতাকে মহাকালের মহানায়কও আখ্যায়িত করবে একদিন।

বঙ্গবন্ধু এমনি এক মহামানব যিনি নিজে স্বপ্ন জাল বুনতে ও দেখতে পারতেন। একই ভাবে সেই স্বপ্ন সকলের মাধে ছড়িয়ে দিয়ে আকাঙ্খায় পরিণত করার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তার। স্বপ্নের জালবোনা আর তাস্ফলন করে থেমে যাওয়া জানতেননা তিনি। স্বপ্নকে বাস্তবে রূপদিতে কখন কোথায় কি করতে হবে তা দিবালোকের মত স্পষ্ট ছিল তার কাছে। তারই প্রতিফল পাওয়া যায় ক্ষনজন্মা এই মহান রাজনৈতিকের জীবন ও কর্মে।

ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর বাংলাদেশ ও বাঙ্গালী নামটি মুছে দেয়া হয়েছিল। পাকিস্তানি শাসকেরা তাদের সংবিধানেই বাংলাদেশের নামটি বদলে রাখেন পূর্ব পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের হাজার বছরের জাতিত্বের পরিচয় মুছে দিয়ে কপালে সেটে দেয়া “পাকিস্তানি” পরিচয় আর এর মাধ্যমে বাঙ্গালী জাতিসত্বাকে বিলিন করে দেয়া হয়।

বাঙালি জাতিকে ধ্বংস করার এই নব্য উপনিবেশবাদী চক্রান্তের বিরুদ্ধেও প্রথম সাহসের সঙ্গে প্রতিবাদ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৫৫ সালের ২৫শে আগস্ট তারিখ পাকিস্তান গণপরিষদে তিনি বলেন, “ স্পীকার মহোদয়, ওরা পূর্ব বাংলার নাম বদল করে পূর্ব পাকিস্তান রাখতে চায়। আমরা বারংবার দাবি জানাচ্ছি, আপনারা বাংলা নাম ব্যাবহার করুন। বাংলা নামের ইতিহাস আছে। আছে নিজস্ব ঐতিহ্য- ট্র্যাডিশন। এই নাম পরিবর্তন করতে হলে বাংলার জনগণের কাছে আগে জিজ্ঞেস করতে হবে, তারা এই নামবদল মানতে রাজি আছে কিনা?” শেখ মুজিবের এই সুস্পষ্ট প্রতিবাদ অগ্রাহ্য করে এবং বাংলাদেশের জনগণের কোন মতামত না নিয়ে পাকিস্তানি শাসকরা বাংলা নামকে মুছে দিয়ে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নামটি চাপিয়ে দিয়েছিলেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে শেখ মুজিব কারান্তল থেকে বেরিয়ে এসে বাঙ্গালির কপাল থেকে এই দাসত্বমুলক পরিচয় মুছে ফেলার পদক্ষেপ নেন। এ বছর ৫ ডিসেম্বর তারিখে তিনি ঘোষণা করেন, “একসময় এদেশ থেকে, এদেশের মানচিত্র থেকে ‘বাংলা’ কথাটার সর্বশেষ চিহ্নও চিরতরে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। শুধু বঙ্গোপসাগর আর কোথাও নামটির চিহ্ন খুজে পাওয়া যায় না। বাংলাদেশের মানুষের পক্ষ থেকে আমি ঘোষণা করছি, আজ থেকে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের নাম পূর্ব পাকিস্তানের বদলে শুধু বাংলাদেশ হবে।”

জনগণের কাছে তিনি ছিলেন বন্ধু। জাতির কাছে তিনি পিতা আর বিশ্বির চোখে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা। শেখ মুজিবই একমাত্র নেতা যিনি রক্তে, বর্ণে, ভাষায়, কৃষ্টিতে এবং জন্মসূত্রেও ছিলেন খাঁটি বাঙালি। তাঁর আকর্ষণীয় ব্যাক্তিত্ব বজ্রকণ্ঠ, ও সাহস তাঁকে এ যুগের এক বিরল মহানায়কে রুপান্তর করেছে”। মনিষিরা তাকে- রাজনীতির কবি বলে আখ্যায়িত করে থাকেন। বিলেতের মানবতাবাদী আন্দোলনের প্রয়াত নেতা মনীষী লর্ড ফেনার ব্রকওয়ে মতে, “ জর্জ ওয়াশিংটন, মহাত্মা গান্ধীর চেয়েও শেখ মুজিব এক অর্থে বড় নেতা”। ১৯৭৩ সালে আলজিয়ারসে জোট নিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুকে আলিঙ্গনাবদ্ধ করে কিউবার নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো বলেছিলেন, “আমি হিমালয় পর্বত দেখিনি। শেখ মুজিব কে দেখলাম। ব্যাক্তিত্ব ও সাহসে মানুষটি হিমালয়। আমি হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতা অর্জন করলাম”। শেখ মুজিবুর রহমান শুধু বাংলাদেশের নন, বাঙালি জাতির মুক্তিদূত। তাঁর বাঙালি জাতীয়তাবাদ বাঙালির সভ্যতা ও সংস্কৃতির নব অভ্যুদয় মন্ত্র। এমন হাজারো বিশ্লেষনই বলে দেয় মুজিব বাঙালির অতীত ও বর্তমানের শ্রেষ্ঠ মহানায়ক।

প্রকৃতপক্ষে এক ক্রান্তিলগ্নের স্বাধীন বাংলাদেশের নবজন্মের প্রথম প্রকাশ্য ঘোষণা বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকেই উচ্চারিত হয়। এটা বাংলাদেশ ও বাঙ্গালি জাতির নব অভ্যুদয়েরও ঘোষণা। বাঙ্গালির ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির অবরুদ্ধ স্রোতের মুক্তিলাভের ঘোষণা। আর এই ঘোষণা বাস্তবায়নে যাঁর দীর্ঘ চব্বিশ বছরের আন্দোলন ও সংগ্রামের ফল তাঁকে বাঙালি জাতির জনক, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাতা-পিতা ছাড়া আর কি যোগ্য নামে ডাকা যায়। বাংলার স্বাধীনতা, ভাষা, সমাজ সংস্কৃতি ও সভ্যতার মধ্যে বঙ্গবন্ধু চিরকালের জন্য চিরজাগ্রত। মৃত্যুঞ্জয় মহান যে মানুষটির শ্রেষ্ঠ র্কীতি বাংলাদেশ, সে নিজে মহাকাব্য কাব্য ছাড়া আর কি কিছু হতে পারে। তাইতো বাংলাদেশ-বঙ্গবন্ধু এই দুটি অভিন্ন নাম ।

আজ সেই মহান দিন, যেই দিনে তুমি জন্মেছিলে বলেই বাংলাদেশ পেয়েছি, স্বাধীনতা পেয়েছি। আজ থেকে ৯৮ বছর আগে তুমি জন্মেছিলে বলেই আমরা একজন বঙ্গবন্ধুকে পেয়েছি। শুভ জন্মদিন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

লেখক: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় শিল্প বাণিজ্য বিষয়ক উপ কমিটির সদস্য

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন