দেশনেত্রীর চিকিৎসায় অবহেলার পরিনাম শুভ হবে না

সময়বাংলা, ডেস্ক: ‘বেগম খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার বিষয়ে রাজনৈতিক কারণে অবহেলা কিংবা বিলম্ব করা হলে তার পরিণাম সরকারের জন্য শুভ হবে না বলে উল্লেখ করেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

তিনি বলেন, দেশবাসী বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন, তারা সরকারের অমানবিক আচরণে ক্ষুদ্ধ’, বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এমন মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিনা ভোটের সরকার বিষয়টিকে রাজনৈতিক বিষয়ে পরিণত করেছে, বেগম জিয়াকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত ও অন্যায়ভাবে এবং তাঁর দেয়া জবানবন্দী বিকৃত করে একটি আদালত তাঁকে পাঁচ বছরের জেল দিয়ে সরকারের ইচ্ছা পূরণ করেছে। বর্তমানে তাঁকে একটি পরিত্যক্ত ঘোষিত নির্জন কারাগারের একমাত্র বন্দী হিসেবে রাখা হয়েছে। ৭৩ বছর বয়স্কা এই সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে যে পরিবেশে রাখা হয়েছে তা যেকোন সুস্থ মানুষকে অসুস্থ করে ফেলার মতো।

তিনি বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে আর্থাইটিস, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। তাঁর দুই হাঁটু এবং দুই চোখেই অপারেশন করতে হয়েছে। ফলে তাঁকে সবসময়ই যোগ্য চিকিৎসকের নিয়মিত পর্যবেক্ষণে থাকতে হয়। অথচ নির্জন এই কারাগারে তাঁকে দেখার জন্য জুনিয়র ডাক্তার ও ডিপ্লোমা নার্স নিয়োগ করে সরকার দাবি করছে যে, বেগম খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ৩ বারের নির্বাচিত এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রীর স্বাস্থ্যের যে অবস্থা তাতে তাঁকে সর্বক্ষণ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে এবং জরুরী পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা প্রদানের ব্যবস্থা রাখা একান্তই জরুরী বলে মতামত দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও সার্জনগণ।

লিখিত বক্তব্যে রিজভী বলেন, দলের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে দুইবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে এসব বিষয় উল্লেখ করে তাঁকে অনতিবিলম্বে ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা এবং এমআরআই সহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর দাবি করা হলে স্বরাষ্টমন্ত্রী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে কিছুই করা হয়নি।
ইতোমধ্যে বেগম জিয়ার অসুস্থতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আর্থাইটিস এর ব্যথা বৃদ্ধির ফলে তিনি চলৎশক্তিহীন হয়ে পড়ছেন এবং পাশাপাশি তাঁর অপারেশন করা চোখ লাল হয়ে আছে। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত তাঁর উপযুক্ত চিকিৎসা না হলে তাঁর শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি হতে পারে। আমরা এটাও সরকারকে জানিয়েছি, কিন্তু তাঁর সুচিকিৎসার কোন ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে গত ৫ জুন তিনি হঠাৎ করে অচেতন হয়ে পড়েন। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি জেল কর্তৃপক্ষ তাঁর পরিবারের কোন সদস্যকেও জানায়নি এবং কেন তিনি অচেতন হয়ে পড়লেন তা পরীক্ষার জন্য কোন ব্যবস্থা নেয়নি।

তিনি বলেন, গত ৮ জুন তাঁর পরিবারের সদস্যগণ নিয়মিত সাক্ষাতে গিয়ে এই বিষয়টি জানতে পারেন।
৫ দফা আবেদনের পর গত ৯ জুন কারা কর্তৃপক্ষের অনুমতিক্রমে দেশনেত্রীর চিকিৎসা করতেন এমন ৪ জন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও ঢাকা সিভিল সার্জনের উপস্থিতিতে তাঁকে দেখতে গিয়ে এই ঘটনার কথা জানতে পারেন। ৫ জুন দুপুর ১টার দিকে দেশনেত্রীর ৫/৭ মিনিট আনকনশাস থাকা এবং সেসময়ের কোন কিছু মনে করতে না পারার বিষয়টিকে চিকিৎসকগণ মারাত্মক বলে মনে করেন। তাদের মতে এটা ছিল ট্রানজিয়েন্ট ইসকেমিক এ্যাটাক-টিআইএ। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী সাংবাদিকদের জানিয়েছেন যে, ‘যেটা সবচেয়ে বিপজ্জনক সেটা হচ্ছে টিআইএ যদি কারও হয়-তাহলে সেটা ইন্ডিকেট করে যে, সামনে তার একটা বড় ধরণের স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশী’।
এই ৪ জন তাদের পর্যবেক্ষণ ও মতামত লিখিত ভাবে কারা কর্তৃপক্ষকে দিয়েছেন। তারা বিশেষ কিছু পরীক্ষা এবং যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেয়ার জন্য দেশনেত্রীকে অবিলম্বে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তির সুপারিশ করেছেন।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের প্রেস ব্রিফিংয়ের পর এ বিষয়ে সরকারের আইনমন্ত্রী, সেতুমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুখ খোলেন। তারা এখন বলছেন যে, ৫ জুন রোজা রাখার কারণে বেগম খালেদা জিয়ার সুগার কমে যাওয়ায় তাঁর মাথা ঘুরে গিয়েছিল মাত্র এবং একটা চকলেট খেয়ে তিনি ভাল হয়ে যান। আইজি প্রিজনও একই কথা বললেও স্বীকার করেছেন যে, দেশনেত্রীর আর্থাইটিস সমস্যা বেড়েছে।

গতকাল থেকে দেশনেত্রীর স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বিএসএমএমইউ-তে নেয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু দেশনেত্রীকে এর আগে সেখানে নেয়া হলে সেখানকার ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ এবং চিকিৎসা সেবার বিষয়ে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন।
আইজি প্রিজন গণমাধ্যমে বলেছেন যে, কারাবিধি অনুযায়ী প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়ার জন্য উর্ধতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। এমন কোন সিদ্ধান্ত না থাকায় দেশনেত্রীকে ঐ হাসপাতালেই নিতে হবে। তিনি আরও বলেন যে, প্রাইভেট হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানকার চিকিৎসা ব্যয় কে বহন করবে সে সম্পর্কেও সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হবে। তার এই বক্তব্য থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতামত এবং আমাদের বারংবার অনুরোধ সত্বেও ইউনাইটেড হাসপাতালে দেশনেত্রীকে ভর্তির ব্যাপারে সরকারের অনীহার কারণ বোঝা গেল।

তথাকথিত ১/১১ এর সরকারের সময়েও ১ বারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেয়া হয়েছিল। আর ৩ বারের নির্বাচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী, দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি এবং সাবেক সেনাবাহিনী প্রধানের স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যাপারে সরকারী অনুমোদন ও অর্থ সংস্থানের বিষয়ে এতদিনেও সিদ্ধান্ত না হওয়া রহস্যজনক এবং নিন্দনীয়।
আমরা দেশনেত্রীর উপযুক্ত চিকিৎসা চাই বলেই আপনাদের মাধ্যমে সরকারকে জানাতে চাই যে, প্রয়োজনে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসার সমূদয় ব্যয় আমাদের দল বহন করবে। কাজেই কাল বিলম্ব না করে তাঁকে ্ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হোক।

তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, গত ৫ জুন তারিখে সংঘটিত এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সম্পর্কে সরকারের মন্ত্রীবর্গ, এটর্নি জেনারেল ও আইজি প্রিজন প্রায় ১ সপ্তাহ পরে ১১ জুন তারিখে মুখ খুললেন কেন ? কেন এতদিন ঘটনাটি চেপে যাওয়ার চেষ্টা করা হলো ? কেন ইতোমধ্যে তাঁর হঠাৎ এত বেশী অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণ অনুসন্ধানের জন্য ব্যবস্থা নেয়া হয়নি ?

এটর্নি জেনারেল বলেছেন যে, ৯ জুন তারিখে ডাক্তারগণ বেগম খালেদা জিয়ার অজ্ঞান হওয়ার কথা বলে নাকি আদালতের সহানুভুতি লাভের চেষ্টা করেছেন। অথচ তিনি অবশ্যই জানেন যে, ডাক্তারদের সাক্ষাতের দিন ক্ষণ স্থির করে সরকার। তারা ৯ তারিখে সাক্ষাতের দিন স্থির করেছে বলেই ঐ দিন ডাক্তারগণ প্রেস ব্রিফিং করেছেন। মামলার দিন তারিখ সরকার ও কারা কর্তৃপক্ষের জানার কথা-ডাক্তারদের নয়। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে মরিয়া এই দলবাজ এটর্নি জেনারেল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর অসুস্থতা নিয়েও অশোভন ও অযৌক্তিক মন্তব্য করার আমরা তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।

তিনি বেগম জিয়ার অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে বলেন, বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরেই নানা অসুস্থতায় ভুগছেন। এটা জানার পরেও তাঁকে আরও অসুস্থ করে ফেলার জন্য পরিত্যক্ত জেলখানার একমাত্র বন্দী হিসেবে নির্জনে রাখা হয়েছে। তাঁকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে না। তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতির কথাও গোপন রাখার অপচেষ্টা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় স্পষ্টত:ই বোঝা যায় যে, ক্ষমতাসীন সরকার তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রীকে অকালে বিনা চিকিৎসায় জীবনে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

খালেদা জিয়াকে অবিলম্বে হাসপাতালে ভর্তির দাবি জানিয়ে বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার বিষয়ে রাজনৈতিক কারণে অবহেলা কিংবা বিলম্ব করা হলে তার পরিণাম সরকারের জন্য শুভ হবে না। দেশবাসী বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা সরকারের অমানবিক আচরণে ক্ষুদ্ধ।
তিনি বলেন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণের পরামর্শ অনুযায়ী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে অবিলম্বে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা হোক। একই সাথে আমরা দাবি করছি যে, মূল মামলায় দেশের সর্বোচ্চ আদালতে জামিন পাওয়ার পরেও সরকার নানা অপকৌশলে দেশনেত্রীর মুক্তির পথে যেসব বাধার সৃষ্টি করছে তা বন্ধ করা হোক, যাতে জামিনে মুক্ত হয়ে দেশনেত্রী তাঁর পছন্দের হাসপাতালে নির্ভরযোগ্য ডাক্তারদের চিকিৎসা সেবা নিতে পারেন।

বেগম জিয়ার মুক্তির দাবিতে কর্মসূচী ঘোষণা করে বলেন, মানবিক কারণে ঈদের আগেই দেশনেত্রীর মুক্তির দাবিতে দেশের বিশিষ্টজনদের সংগঠন শত নাগরিক কমিটি আজ সকাল ১০টায় জাতীয় শহীদ মিনারে মৌন অবস্থান কর্মসূচির ঘোষনা দেয়। আজ যথাসময়ে শত নাগরিক কমিটির আহবায়ক প্রখ্যাত রাষ্ট্র বিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজ উদ্দিন আহমেদ এর নেতৃত্বে বিশ^ বিদ্যালয়ের শিক্ষক, কবি, সাহিত্যিক, চিকিৎসক ও আইনজীবিগণ শহীদ মিনারে উপস্থিত হলে পুলিশ বিনা উস্কানীতে মৌন অবস্থান কর্মসূচি পন্ড করে দেয় এবং ড. এমাজ উদ্দিন আহমেদ সহ দেশের বিশিষ্ট জনদের সাথে নির্দয় আচরণ করে।

বিএনপির পক্ষ থেকে এই ঘটনার প্রতিবাদ জানান রিজভী।

সময়বাংলা/আইসা

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন

এ বিভাগের আরো খবর