নারায়ণগঞ্জ-৪: লড়াই হবে নৌকা-ধানেই

সময় বাংলা ডেস্ক: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জ-৪ (সিদ্ধিরগঞ্জ-ফতুল্লা) আসনে বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীরা তৎপর হয়ে উঠেছেন। প্রায় সাত লাখ ভোটার অধ্যুষিত এ নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেতে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। তারা নিয়মিত দলীয় কর্মসূচিসহ নানা সামাজিক কর্মসূচিতেও অংশগ্রহণ করছেন। তবে দল যাকে মনোনয়ন দিবে তার হয়েই কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রার্থীরা।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন সারাহ বেগম কবরী। তিনি নির্বাচিত হওয়ার পর নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে এ আসনে তেমন উন্নয়ন হয়নি।

পরবর্তীতে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একেএম শামীম ওসমান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি নির্বাচিত হওয়ার পর এলাকার উন্নয়নের পাশাপাশি নিজ দলের কোন্দল মিটিয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে তিনিই একমাত্র শক্তিশালী প্রার্থী।

তাকে কেন্দ্র করেই জেলায় আওয়ামী লীগ রয়েছে শক্ত অবস্থান। তাছাড়া আওয়ামী লীগের জন্য ওসমান পরিবারের রয়েছে অনেক আত্মত্যাগ। তিনি ৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত এ আসনে সংসদ সদস্য ছিলেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই-সংগ্রামে ওসমান পরিবারের অবদানের কারণে দলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে শামীম ওসমানের গ্রহণযোগ্যতা।

অপরদিকে, শামীম ওসমানের দৃঢ় নেতৃত্বে এ আসনে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভিত অনেক শক্তিশালী। তাই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও ত্যাগী নেতা হিসেবে এ আসনে শামীম ওসমানের বিকল্প নেই।

তবে শ্রমিকলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির শ্রমিক কল্যাণ ও উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক কাউসার আহম্মেদ পলাশ ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবুর রহমান মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা যায়।
শ্রমিক নেতা কাউসার আহম্মেদ পলাশের ফতুল্লা এলাকায় রয়েছে শক্ত অবস্থান। বিশেষ করে শ্রমিকদের মধ্যে পলাশের ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে।

তিনি জানান, নবম ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমি দল থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলাম। এবারও দল থেকে মনোনয়ন চাইব। দল যদি আমাকে যোগ্য মনে করে তাহলে মনোনয়ন পাব। না হলে যাকে দল মনোনয়ন দিবেন তার পক্ষে কাজ করবো।

এছাড়া, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবুর রহমান মনোনয়ন চাইলেও মূলত তিনি শামীম ওসমানের অনুগত লোক। শামীম ওসমানের বাইরে তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা তেমন নেই বলে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন।

অন্যদিকে এ আসনে বিএনপির চারজন নেতা দলীয় মনোনয়ন চাইছেন। তারা হলেন, বিএনপি নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি শিল্পপতি শাহ আলম, বর্তমান জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ, সাবেক সংসদ সদস্য আলহাজ মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন ও নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সহ-সভাপতি ব্যারিস্টার পারভেজ আহম্মেদ।

শাহ আলম নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সারাহ বেগম কবরীর কাছে মাত্র আড়াইশ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন। তবে বিএনপি মনে করে শাহআলমকে জোর করে হারানো হয়েছিল। নিজ দলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে শাহ আলমের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।

অধ্যাপক মামুন নিজেকে প্রার্থী ঘোষণা না দিলেও দলীয় নেতাকর্মীরা তার পক্ষে প্রচার-প্রচারণায় নেমে পড়েছেন। তিনি ক্লিন ইমেজের এবং সৎ মানুষ হিসেবে পরিচিত।

সাংগঠনিক দক্ষতা ও আন্দোলন সংগ্রামে ধারাবাহিক ভূমিকা পালনের কারণে ছাত্রদলের তৃণমূল থেকে ক্রমান্বয়ে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের পদ লাভ করেছেন।

দলের উচ্চ পর্যায় তার সাংগঠনিক দক্ষতা, সততা ও পরিচ্ছন্ন ইমেজের কথা জানেন।
অপরদিকে গিয়াস উদ্দিন অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেসময় তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে নদী দখল, ভূমি দখল, দলীয় কর্মীদের হয়রানি ও নির্যাতনের অভিযোগে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিলেন।
ওই নির্বাচনের কিছুদিন আগে তিনি কৃষকলীগ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন।

এর আগে তিনি জাতীয় পার্টি করতেন। বারবার দল বদলের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিএনপির নেতা-কর্মীদের অভিযোগ গিয়াস উদ্দিন দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে ২০১০ সালে ১৫ আগস্টের কর্মসূচি পালন করেছেন।
গেলো ৮ বছরে বিএনপি ঘোষিত কোনো আন্দোলন কর্মসূচিতে একবারের জন্যও তাকে রাজপথে দেখা যাননি। এমনকি দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সমাধিতে ফুল দিতেও যাননি তিনি। সর্বশেষ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে দলের চেয়ারপার্সনের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও দলীয় প্রার্থীর পক্ষে সঠিকভাবে কাজ করেননি গিয়াসউদ্দিন। দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও একের পর এক বিতর্কিত কাজ করে তিনি নেতাকর্মীদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। এসব কারণে দলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে গিয়াস উদ্দিনের অবস্থা এখন নড়বড়ে।

দলের নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, এ আসনে শাহ আলমই এগিয়ে রয়েছেন। তার পরের অবস্থান অধ্যাপক মামুন মাহমুদের। মামুন মাহমুদ ও শাহ আলমের মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা। আর এ দুই শক্তিশালী নেতার সঙ্গেই রয়েছে গিয়াস উদ্দিনের চরম বৈরিতা।

নারায়ণগঞ্জ বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ বলেন, ‘দলের জন্য কাজ করছি। দল চাইলে আমি নির্বাচন করবো। দলের দুর্দিনে আন্দোলন, সংগ্রাম করেছি রাজপথে। তৃণমূল থেকে আমি নেতৃত্ব দিয়ে আসছি। আমার ধ্যানজ্ঞান বিএনপির জাতীয়তাবাদী শক্তি। সুতরাং দল যেকোনো পরিস্থিতিতে যে দায়িত্ব দিবে তা আমি যথার্থভাবে পালন করবো।

প্রার্থী হওয়া প্রসঙ্গে জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ব্যারিস্টার পারভেজ আহম্মেদ জানান, আমি নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলাম। এবারও দল থেকে মনোনয়ন চাইবো।’
রাজপথে আন্দোলন সংগ্রামে ভূমিকা ও তরুণ নেতা হিসেবে দল থেকে মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে তিনি প্রত্যাশা করছেন। তবে মনোনয়ন না পেলেও দল যাকে মনোনয়ন দিবেন তার পক্ষেই কাজ করবেন বলে জানান তিনি।

পারভেজ আহম্মেদ আরো বলেন, বিএনপি একটি বড় দল। এ দলের অনেক কিছু রয়েছে। দল চাইলে যে কাউকে যেকোনো সুযোগ দিতে পারে। তবে উভয় দলের স্থানীয় নেতারা মনে করছেন, এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে শামীম ওসমান এবং বিএনপি থেকে শাহআলমই দলীয় মনোনয়ন পেয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে ভোটার সংখ্যা ছিলো ৮ লাখ ২৬ হাজার ৭শ’৩০ জন। তার মধ্যে পুরুষ ভোটার ৪ লাখ ২২ হাজার ৯২০ জন, মহিলা ভোটার ৪ লাখ ৪ হাজার ১০ জন। যা নির্বাচনের আইন অনুযায়ী ভোটার সংখ্যার দ্বিগুণ। ফলে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিদ্ধিরগঞ্জকে আলাদা আসন করার জন্য সরকার দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ সব দলেই দাবি জানিয়েছেন। যদি নির্বাচন কমিশন সিদ্ধিরগঞ্জকে আলাদা আসন করেন তবে নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ ভিন্ন হতে পারে।

অপর দিকে বর্তমান সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি থেকে এ আসনে এখন পর্যন্ত কোনো প্রার্থীর নাম শুনা যায়নি বলে নারায়ণগঞ্জ মহানগর সাধারণ সম্পাদক আকরাম আলী খান শাহীন জানিয়েছেন।
এছাড়াও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে অন্যান্য বাম-ডান ও ইসলামী দলগুলোও ভেতরে ভেতরে নির্বাচনী প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। তবে তারা এখনেই প্রার্থীর নাম প্রকাশ করতে রাজি নন।

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন

এ বিভাগের আরো খবর