নিজস্ব ভাষাটাও ভুলে গেছে চা শ্রমিক আদিবাসীরা

এম সেলিম, ফটিকছড়ি সংবাদদাতা : নিজস্ব সংস্কৃতি ও জীবন চর্চা থেকে সরে যাচ্ছে চা বাগানে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ। দারিদ্র্যতা অসচেতনতা এবং বিচ্ছিন্নভাবে চা বাগানগুলোতে বসবাসের কারনে নিজেদের ভাষা ও কৃষ্টি জানেনা এ প্রজন্মের অনেকেই। চা বাগানে অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সাথে সহাবস্থানের কারনে ‘চা শ্রমিক’ হিসেবে তাদের পরিচয় তৈরী হয়েছে। যার কারনে তাদের নৃ-তাত্বিক পরিচয় পড়ে যাচ্ছেতাই আড়ালে।
চট্টগ্রাম জেলার হালদা, কণফুলী,  উদলিয়া, বারমাসিয়া,নেপসুন ,হাজারীখীল এসব চা বাগানে চা শ্রমিক হিসেবে মুন্ডা, কুলি,সাঁওতাল, ওঁড়াও, মাহালি, সবর, পাসি, রবিদাস, হাজরা, নায়েক, বাউরি, তেলেগু, তাঁতি, কৈরী, দেশওয়ারা, বর্মা, কানুনগোই, পানিকা, কুর্মী, চাষা, অলমিক, মোদি, তেলি, পাত্র, মাঝি, রাজবংশী, মোদক, বাড়াইক, ভূমিজসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর কয়েক হাজার মানুষ বসবাস করেন। বর্তমানে এদের অধিকাংশ অতি দরিদ্র হওয়ায় তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও জীবন চর্চা সম্ভব হচ্ছেনা। নিজেদের ভাষা কৃষ্টি ও সংস্কৃতি চর্চা কমে আসায় এখন তারা নিজেদের নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয় নিয়েই পড়েছেন সংকটে। আর্থ সামাজিক অবস্থার কারনেও অনেক সময় তারা নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয় ধরে রাখতে পারছে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এছাড়া চা শ্রমিকেরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কুলি ভাষায় কথা বলেন। যার ফলে নিজেদের ভাষা ব্যাবহারের ক্ষেত্রও কমে গেচে।
অবশ্য সাবি জানে না নিজের আত্মপরিচয়, ভাষা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি সম্পর্কে। শুধু সাবিই নয়, এই অবস্থা তার বান্ধবী দিপালী মুন্ডারও। দিপালী জানায়, তাদের আলাদা সংস্কৃতি কী? তা সে জানেনা। সবার সাথে যে ভাষায় (বাংলা ও ভূজপুরী ভাষায় মিশ্রণ) কথা বলে, পরিবারেও সে ভাষায়ই কথা বলে। নিজেদের কোন ভাষা আছে বলে তার জানা নেয়।

হালদা বাগানের উত্তম জানান,  বাষা নিয়ে মাথাব্যাথা নেই। টিকে থাকতে  সংগ্রাম করে জীবন পার হচ্ছে, এর বাইরে অন্য কিছু ভাবার সময় নেই ।

মাধরী জানায়, হাজারী খীল  চা বাগানে তারা মাত্র কয়েকশত পরিবার বাস করে। এখানে তারা সংখ্যায় অল্প বলে নিজেদের অনুষ্ঠানাদি তেমন হয়না। যার ফলে তারা তেমন কিছু শিখতে পারছেনা।

তাদের আর্থ সামাজিক অবস্থা এমন এক পর্যায়ে গেছে এখন অনেকে তাদের আত্মপরিচয় যেমন ভুলেছে তেমনি অনেকে আত্মপরিচয় গোপন করছে বাধ্য হয়েই। কারন আদিবাসী চা জনগোষ্ঠীর মানুষ সমাজের মূলস্রোত হতে বিচ্ছিন্ন। তারা সংখ্যালঘু ও বিচ্ছিন্ন হওয়ায় এবং সমাজে তাদের খাটো করে দেখার জন্যে, তারা ভাবে এই সমাজে তারা গ্রহনীয় নয়। তাই অনেকেই নিজেদের পরিচয় গোপন করছেন। যেমন- দলিত নৃগোষ্ঠী শব্দকর সমাজের অনেকেই এখন ‘শব্দ’ বাদ দিয়ে শুধু ‘কর’ লিখেন। এটা আমাদের জন্য লজ্জার। প্রায় সকল সূচকে পিছিয়ে পড়া এসব ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী সংগঠিতভাবে তাদের জীবন চর্চা, সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্যকে লালন করার মাধ্যমে এরা রক্ষা পাবে। আর এই দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে।

তাদের ভাষা সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে পারলে তাদের আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠিত হবে। এজন্য সরকারের কিছু উদ্যোগ রয়েছে।   নিজেদের উপস্থাপন করতে পারে।

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন