পুলিশের বিরুদ্ধে নুরু হত্যায় জড়িত থাকার দলিল (ভিডিও সহ)

সময় বাংলা ডেস্ক: কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহসাধারণ সম্পাদক নুরুল আলম নুরু সরকারের টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হয়েছেন এবং পুলিশ গ্রেফতারের পর তার লাশ পাওয়া গেছে বলে মনে করেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। তারা বলছেন, ২০০৮ সালের পর থেকে নিজ এলাকা রাউজানে যেতে পারেননি নুরু। এমনকি তিন মাস আগে বাবার জানাজায়ও অংশ নিতে পারেননি সন্ত্রাসীদের ভয়ে। ব্যবসায়িক কাজে বেশিরভাগ সময় ঢাকা ও সিলেট থাকতেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে সংগঠনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে যোগ দিতে থাকেন। তার সাংগঠনিক কার্যক্রম ও তৎপরতা বাড়ছিল। মূলত এ কারণেই নুরুল আলম নুরু সরকারি দলের লোকজনের টার্গেটে ছিলেন।

বুধবার রাতে নুরুকে তুলে নেয়ার পর বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা ফোন করে তাকে আদালতে সোপর্দ করতে পুলিশের কাছে অনুরোধ করেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক উপদেষ্টা জাহিদ এফ সরদার সাদী রাউজান ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই জাবেদকে ০১৬২০৪৫৩৮৯১ মোবাইল নম্বরে ফোন করে নুরুকে আদালতে সোপর্দ করার অনুরোধ করেন। শেখ জাবেদ উত্তরে বলেন, হ্যাঁ.. এ বেপারে আরো কয়েকজন ফোন করেছে, আমি ওসি স্যারকে বলেছি আসামী ধরা হয়েছে। তারা জঙ্গি অভিযানে ব্যস্ত আছেন। কথোকোপনের এক পর্যায়ে শেখ জাবেদ নুরুল আলম কে ধরার কথা স্বীকার করেন। সরদার সাদীর মোবাইল ফোনের কথোপকথনের রেকর্ড ছড়িয়ে পড়েছে ফেসবুকে। এটিই এখন পর্যন্ত পুলিশের বিরুদ্ধে নুরু হত্যায় জড়িত থাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। এ হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেছে দেশে ও প্রবাসের জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সহ বিএনপি’র সকল অঙ্গ সংঘঠন।

যদিও এসআই জাবেদ নিজেকে নির্দোষ দাবি করছেন, বিভিন্ন মিডিয়ার দেয়া বক্তব্যে তিনি ঔদিন সেখানে থাকার কথা অস্বীকার করেন। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে তিনি সেখানে ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, বুধবার রাত ১২টার দিকে নগরীর চকবাজার থানাধীন চন্দনপুরা মিন্নি মহলের বাসা থেকে ১০-১২ জন পুলিশ পরিচয়ে তাকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে নিয়ে যায়। এদের মধ্যে তিনজন ছিলেন পুলিশের পোশাক পরা। এদের একজনের নেমপ্লেটে জাবেদ লেখা ছিল। ইউনিফর্মে ছিল এসআই র‍্যাংকের। তারা নূরুকে সাদা রঙের একটি টয়োটা হাইয়েস গাড়িতে করে নিয়ে যায়। গাড়ির নম্বর (চট্ট মেট্টো চ -১১-৭৭) লেখাটি তাঁরা দেখতে পেয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই এসআই জাবেদ (শেখ জাবেদ) হলো সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা।

বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় রাউজানের বাগোয়ান ইউনিয়নের খেলারঘাট এলাকায় কর্ণফুলী নদীর পাড়ে নুরুর (৪০) লাশ পাওয়া যায়। লাশের দুই হাত ও পা নাইলনের রশি দিয়ে বাঁধা ও মুখে কাপড় ঢোকানো ছিল। মাথায় গুলি ও সারা শরীরে ছিল জখমের চিহ্ন। এবিষয়ে সময়বাংলার পক্ষথেকে জাহিদ এফ সরদার সাদীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সময় বাংলাকে বলেন, তিনি নুরুকে ধরে নেবার ঘন্টা ৩ পরে এসআই জাবেদের মোবাইফোনে কল করেন, এসআই জাবেদ ঘুমে ছিলেন বিধায় সাদীকে চিনতে না পেরে বেশ কয়াকবার সাদীর পরিচয় জানতে চান, এসআই জাবেদ বলেন আমি ঘুমে ছিলাম তাই আপনাকে চিনতে পারিনি, আপনার পরিচয়টা দিন প্লিজ।

সাদী আরো বলেন, এসআই জাবেদ প্রথম আলোতে বলেছেন বুধবার দিবাগত রাত সেসময় তিনি রাউজানের একটি মাদ্রাসা এলাকায় জঙ্গিবিরোধী অভিযানে ছিলেন। নুরু নামের কাউকে শহর থেকে আটক করার বিষয়টি তার জানা নেই। অথচ আমি তার মোবাইলে কল করলে সে স্বীকার করে যে আসামী ধরা হয়েছে, সেকথা তিনি ওসিকেও বলেছেন। তাহলে সাফ সাফ বুঝা যাচ্ছে তিনি নিজেকে এবং এই হত্যার নেপথ্যে নায়কদের বাচাঁনোর জন্য মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছেন।

সরদার সাদী সময়বাংলাকে আরো বলেন, যখন শুনতে পেলাম নুরুকে তুলে নিয়ে গেছে তখনি অজানা এক আশঙ্কায় বুক দরফর করতে থাকে।  নুরুর সাথে আমার যোগাযোগ দীর্ঘ দিনের । নুরুকে তুলে নেবার পর চট্রগ্রামের বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ এসাই জাবেদকে ফোন করেন, পরবর্তীতে আমি এসাইকে ফোন করি, এবং তার আমার ফোন আলাপ রেকর্ড করি। যখন তিনি স্বীকার করলেন যে নুরুকে ধরা হয়েছে, তখন আশস্ত্ব হই এবং নুরুকে আদালতে সোপর্দ করার অনুরুধ করি। কিন্তু কে জানত এমনটি ঘটবে।  নুরুর মৃত্যুর সংবাদের পর এই হত্যা প্রমান স্বরুপ ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করি। দুপুরে চট্টগ্রামের জমিয়তুল ফালাহ জামে মসজিদ মাঠে বাদ জুমা নুরুর প্রথম ও রাউজানে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে মা-বাবার পাশে তার লাশ দাফন করা হয়। জানাজায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানসহ কেন্দ্রীয় ও জেলা নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এর আগে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা মর্গে যান নুরুর লাশ দেখতে। তারা এটিকে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড এবং এজন্য সরকারদলীয় সন্ত্রাসী ও প্রশাসনকে দায়ী করেন। তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও তদন্ত দাবি করেন।

সরকারের টার্গেট কিলিংয়ের শিকার ছাত্রদল নেতা নুরু’ পুলিশ গ্রেফতারের পর নুরুর লাশ পাওয়া গেছে, মর্গে লাশ দেখতে গিয়ে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, নুরুকে বুধবার রাতে পুলিশ ধরে নিয়ে নিয়ে যায়। পরের দিন দুপুরে লাশ পাওয়া যায়। বর্তমান সরকারের যে রাজনীতি, তার শিকার হয়েছে ছাত্রদল নেতা নুরু। মর্গে কথোপকথনের একপর্যায়ে বিএনপি নেতা শহীদ উদ্দিন চৌধুরী অ্যানি ওসি মহিউদ্দিন মাহমুদকে উদ্দেশ করে বলেন, বিএনপি নেতাকর্মী নিধনে বর্তমান সরকারের চলমান হত্যাকাণ্ডের প্রক্রিয়ার অংশ এটি।

এরপর ওসি মহিউদ্দিন মাহমুদ বলেন, এ ধরনের ঘটনা ঘটছে, ঘটবে। এ সময় বিএনপি নেতারা উত্তেজিত হয়ে পড়েন। এ সময় আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে ওসির বাকবিতণ্ডা হয়। ওসির এমন মন্তব্য বিএনপির নেতৃবৃন্দ বলেন, যাদের জনগনের নিরাপত্তা দেয়ার কথা তারা যদি বলেন এ ধরনের ঘটনা ঘটছে, ঘটবে তবে জনগন কোথায় দাড়াবে, বাংলার জনগন পুলিশ ভয়ে ভীত, পুলিশ জনগনকে হুমকি দিচ্ছে, এভাবে একটি দেশ চলতে পারেনা।

নগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, সরকারের টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হয়েছেন ছাত্রদল নেতা নুরু। এজন্য তিনি প্রশাসন ও সরকারি দলের সন্ত্রাসীদেরও দায়ী করেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, সিএমপির আওতাভুক্ত এলাকার বাসা থেকে নুরুকে তুলে নেয়া হয়েছে। পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশ লেখা সাদা পোশাকধারী লোকজন ছাত্রদল নেতা নুরুকে তুলে নিয়েছে চকবাজারের বাসা থেকে। জেলা বা রেঞ্জ পুলিশ বলছে, তাদের কোনো লোক সিএমপিতে যায়নি।যদি তাই হয়, তবে সিএমপি এ ঘটনার দায় এড়াতে পারে না। সিএমপিকেই বের করতে হবে, কারা ছাত্রদলের একজন উচ্চপর্যায়ের গ্রহণযোগ্য ও ক্লিন ইমেজের নেতাকে তুলে নিল। যেভাবে তাকে হাত-পা বেঁধে নির্মমভাবে হত্যা করেছে, তা একাত্তরের গণহত্যাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। নুরু কোনো ক্যাডার না, সন্ত্রাসী না। তাকে এভাবে তুলে নিয়ে হত্যার ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।

শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় নুরুর লাশ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে নেয়া হয়। সেখানে আগে থেকেই বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী লাশ দেখতে ভিড় জমান। লাশ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেকে। উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, কেন্দ্রীয় নেতা আমান উল্লাহ আমান, গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী, খায়রুল কবীর খোকন, শামীমুর রহমান শামীম, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, ডা. ফাওয়াজ হোসেন শুভ, মহানগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন, সিনিয়র সহসভাপতি আবু সুফিয়ান, সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর, ডা. খুরশিদ জামিল চৌধুরী, ওয়ার্ড কাউন্সিলর মনোয়ারা বেগম মণি, ভিপি নাজিম প্রমুখ।

ময়নাতদন্ত শেষে বেলা ১২টার দিকে স্বজনদের লাশ বুঝিয়ে দেয়ার পর বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা লাশ নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করে। প্রথম জানাজা শেষে নুরুর লাশ নাসিমন ভবনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে নিতে চাইলে অনুমতি দেয়নি আইনশৃংখলা বাহিনী।  রাউজানে দ্বিতীয় দফায় জানাজায় অংশ নিতে বিএনপির নেতাকর্মীরা জড়ো হলেও সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের বাধায় তাদের ফিরে যেতে হয়েছে বলে পরিবারের অভিযোগ।

নুরুর বন্ধু শাহাদাত হোসেন যুগান্তরকে বলেন, জানাজায় যাতে নেতাকর্মীরা অংশ নিতে না পারে, সেজন্য সকাল থেকে এলাকায় সশস্ত্র মহড়ায় ছিল আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের লোকজন।

এদিকে শুক্রবার বাদ আসর রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে নুরুল আলম নুরুর গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার আগে কেন্দ্রীয় সিনিয়র নেতা আবদুল্লাহ আল নোমান, মোহাম্মদ শাহজাহান, রুহুল কবির রিজভী, হাবিব উন নবী খান সোহেল, ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান প্রমুখ বক্তব্য দেন। জানাজায় অংশ নেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আবদুস সালাম, আবুল খায়ের ভূঁইয়াসহ কয়েকশ’ নেতাকর্মী। এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বৃহত্তর চট্টগ্রামে (চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলা এবং রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজার জেলা) অর্ধদিবস হরতাল পালন করেছে মহানগর বিএনপি ও মহানগর ছাত্রদল।

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন