পৌর নির্বাচন: হেরে গেলো গণতন্ত্র?

সময় বাংলা ডেস্ক :

capture4_110486পৌরনির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ছলে, বলে ও কৌশলে জিতলেও হেরে গেছে গণতন্ত্র, পড়েছে গণতন্ত্রের ওপর কুঠারাঘাত। এমনই মন্তব্য করেছেন দেশের বিশিষ্টজনেরা। কারো কারো মতে, বাংলাদেশের গণতন্ত্র যে চরম সংকটাপন্ন অবস্থায় পড়েছে তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটলো পৌর নির্বাচনে জনমানুষের ভোটের অধিকার হরণের মাধ্যমে।

দীর্ঘ সাত বছর পর দলীয় প্রতীকে মুখোমুখি হলো প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। বিএনপি বলেছিল গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থে তারা পৌর নির্বাচনে এসেছে। আওয়ামী লীগ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারা  গণতন্ত্র রক্ষা করবে। কিন্তু পৌর নির্বাচনে গণতন্ত্র কতটুকু রক্ষা হলো এ প্রশ্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। নির্বাচনে জেতার জন্য আওয়ামী লীগের ন্যাক্কারজনক কর্মকাণ্ডে হতাশ হয়েছেন গণতন্ত্রমনা দেশের মানুষ। বিশ্লেষকরা এ নির্বাচনকে চরম কারচুপি ও জালিয়াতি এবং কেউ কেউ ভোট ডাকাতির নির্বাচন বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবে আওয়ামী লীগ ও ইসি  এটাকে স্মরণকালের ভালো নির্বাচন বলে অভিহিত করলো।

গত সিটি নির্বাচনেও ব্যাপক কারচুপি করেছে ক্ষমতাসীন দল। যার ভুরি ভুরি প্রমাণ রয়েছে প্রকাশিত বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। তখনও গণতন্ত্র হোঁচট খেয়েছিল। এরপর এবার আবার পৌর নির্বাচনেও আরেকবার হারলো গণতন্ত্র।

পর্যবেক্ষকদের মতে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন, সিটি নির্বাচন ও পৌর নির্বাচনে যেভাবে ভোট কারচুপি হলো তাতে গণতন্ত্র পা পিছলে পড়ে গেলো। আর এ থেকে উত্তরণের উপায় রাজনীতিবিদদেরই বের করতে হবে।

স্বাধীন নির্বাচন কমিশন নিয়ে বাংলাদেশে বহু আলোচনা হয়েছে। অনেকেই বলেছিলেন, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করলেই অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজন নেই। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ছিল একতরফা। সে নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের কিছু করারও প্রয়োজন ছিল না। যদিও ইতিহাসের দায়ভার এড়ানোর সুযোগ কমিশনের নেই।

এরপর দীর্ঘ ছুটিতে গিয়েছিলেন কাজী রকিব উদ্দিন আহমেদ। সে সময় তার বিবেক তাড়িত হওয়ার নানা গুঞ্জনও শোনা গিয়েছিল। স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা কতদূর তা ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময়ই অনেকটা খোলাসা হয়ে গিয়েছিল। তার পর মানুষ আশা নিয়ে ছিল একটি ভালো নির্বাচনের  জন্য। এর আগে নির্বাচন কমিশন মেরুদ-হীন, এ কথা বিএনপি নেতারা, এরশাদসহ অনেকইে বলেছেন। দেখা যাচ্ছে, এখন পর্যন্ত এ থেকে বেরুতে পারেনি নির্বাচন কমিশন।

দেশের চলমান পৌরসভা নির্বাচনকে গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থে একটি চ্যালেঞ্জ নির্বাচন হিসেবে অভিহিত করেছিলো বিএনপি। তাই আন্দোলনের বিকল্প হিসেবে বিএনপির এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ। এ কারণেই এ নির্বাচনে যতই চাপ আসুক নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবে না বিএনপি বলে নেতারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত তারা মাঠে থেকেছেন।

পৌর নির্বাচনে গণতন্ত্র পাস করেনি বলে মন্তব্য করেন লেখক ও অধ্যাপক ড. সলিমুল্লাহ খান। তিনি বলেন, একজনের ভোট আরেক জন দিয়ে দেয়। ভোট কারচুপি হয়। এটাকে বলে ইমপারসনিফিকেশন করা, যেটা গণতন্ত্রের মূল কাজ নয়।

পৌর নির্বাচন নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের দেশে গণতন্ত্র পাস করেনি। আদর্শ নির্বাচন বলে বিশ্বে কোন নির্বাচন নেই। তবে তুলনামূলক ভাল নির্বাচনই হচ্ছে আদর্শ নির্বাচন। তিনি যশোরে এক পৌরসভায় বিকেল ৩টার মধ্যে ভোট গণনা শেষ হওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, এমন ঘটনা কোনো নির্বাচন হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। এছাড়া চট্টগ্রামে সংঘর্ষে একজন নিহত হয়েছে। এটিও অপ্রত্যাশিত।

বিশিষ্ট সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ বলেছেন, ফলাফল কি হবে তা নির্বাচন অনুষ্ঠানের দু’দিন আগেই আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফের  দেয়া বক্তব্য থেকে স্পষ্ট বুঝা গেছে।

তিনি বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে সরকার বদল হয় না তবে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে গণতন্ত্রের প্রতি জনগণের শ্রদ্ধা বাড়ে। আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনে জনগণের রায়কে লুন্ঠন করেছে। নির্বাচনে সহিংস ঘটনার চিত্র সংখ্যায় কম হলেও গণতন্ত্রের প্রতি কুঠারাঘাত পড়েছে। আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনে জিতলেও যে অনিয়ম করেছে তা জাতির গায়ে কলঙ্ক লেপে দিয়েছে। এ জন্য তাকে ভবিষ্যতে চরম মূল্য দিতে হবে।

‘ডেইলি নিউ নেশন‘ এর সাবেক সম্পাদক মোস্তফা কামাল মজুমদার বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলা হলেও জনগণ প্রত্যক্ষ করেছেন কি ঘটেছে। জনগণের উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতাকে কেউ বিলীন করে দিতে পারে না। দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য গণরায়কে মূল্য দিতে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন হওয়া অপরিহার্য।

সুশাসনের জন নাগরিক- সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য। তিনি বলেন, এবারের পৌরসভা নির্বাচনে একজন মানুষ নিহত হয়েছে। শতাধিক আহত ও ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে এমনটি হয়ত হতো না বলে মনে হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, এবারের পৌর নির্বাচনে নানা অনিয়ম ও কারচুপির ঘটনা ঘটেছে। ফলে এ নির্বাচনকে সুষ্ঠু বলা যায় না।সূত্র: শীর্ষ নিউজ

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন