ফের মুখোমুখি এরশাদ-রওশন

সময় বাংলা ডেস্ক :

ershad-roushonআবারও মুখোমুখি অবস্থানে এরশাদ দম্পতি। জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের অনুসারীদের মধ্যে ফের বাগ্যুদ্ধ শুরু হয়েছে। গতকাল রোববার দুপুরে রওশনপন্থিদের অনুপস্থিতিতে জাপার প্রেসিডিয়াম সভায় এরশাদপন্থিরা মন্ত্রিসভা ছাড়ার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্ত হয়, আগামী ১৬ এপ্রিল হবে জাপার কাউন্সিল। সন্ধ্যায় রওশনপন্থিরা সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে বলেন, এই সভা অবৈধ। সরকার ছাড়ার প্রশ্নই ওঠে না।
রওশন এরশাদ গতকাল সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, সভার বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। প্রেসিডিয়ামের সভায় কী সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা দলীয়ভাবে জানার পর প্রতিক্রিয়া জানাবেন। ভাবি রওশনের নীরবতাকে সমর্থন বলে মনে করছেন দেবর ও জাপার কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের। তিনি বলেন, ‘উনি (রওশন) আমাদের সঙ্গেই আছেন। কয়েকজন তাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।’
আওয়ামী লীগপন্থি পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও বিরোধী দলের চিফ হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরী প্রেসিডিয়ামের সভাকে অবৈধ বলায় ক্ষোভ প্রকাশ করে জিএম কাদের বলেন, ‘তারা মন্ত্রিত্ব টিকিয়ে রাখতে এগুলো বলছেন। বাড়াবাড়ির সীমা ছাড়িয়ে গেছে।’
গতকাল দুপুরে এরশাদের বনানী কার্যালয়ে প্রেসিডিয়ামের সভা অনুষ্ঠিত হয়। ৩৭ প্রেসিডিয়াম সদস্যের ২৪ জন সভায় যোগ দেন। রওশন এরশাদ এবং জাপার মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-এমপিরা এ সভা বর্জন করেন। জাপার ৪০ এমপির ১৩ জন প্রেসিডিয়ামের সদস্য। তাদের মাত্র দু’জন সভায় উপস্থিত ছিলেন।
সভা শেষে জিএম কাদের দাবি করেন, জাপায় বিরোধ নেই। রওশনপন্থিদের অনুপস্থিতি সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে কাদের বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি থাকায় সভায় যোগ দিতে পারেননি। এতে বিভেদ বোঝায় না।
জিএম কাদের জানান, প্রেসিডিয়াম সদস্যরা সরকার ছাড়তে একমত হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সভায় যারা উপস্থিত ছিলেন তারা সবাই মতামত দিয়েছেন রাজনীতির স্বার্থে মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে আসাটা অত্যন্ত জরুরি। চেয়ারম্যানের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে।’
সন্ধ্যায় জিএম কাদেরের উল্টো বক্তব্য দেন আনিসুল ইসলাম। তিনি সংসদের লবিতে সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রেসিডিয়াম সভার নামে যে বৈঠক হয়েছে তা অবৈধ। বৈঠকে যেসব সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেসবের আইনি ভিত্তি নেই। এগুলো কার্যকর হবে না। মন্ত্রিসভা ছাড়ার প্রশ্নই ওঠে না।’
তার বক্তব্যের জবাবে জাপা মহাসচিব এবিএম রুহুল আমীন হাওলাদার সমকালকে বলেন, ‘ব্যক্তিগত মতামতে দল চলে না। আনিসুল ইসলামের জানা উচিত দল চলে গঠনতন্ত্রে। প্রেসিডিয়াম দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম। সভার প্রত্যেক সদস্যের কাছে দলের চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত সমাদৃত হয়েছে।’
গত ১৭ জানুয়ারি জিএম কাদেরকে দলের কো-চেয়ারম্যান নিয়োগ করে রওশনপন্থিদের বিরোধিতার মুখে পড়েন এরশাদ। তারা রওশনকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুকে মহাসচিবের পদ থেকে সরিয়ে রুহুল আমীন হাওলাদারকে এই পদে ফিরিয়ে আনেন এরশাদ। রওশনপন্থিদের দাবি, জিএম কাদের ও হাওলাদারের নিয়োগ বাতিল করতে হবে। ২৩ জানুয়ারি রওশন এক বিবৃতিতে একই দাবি করেন। পরের দিন রওশনকে চিঠিতে এরশাদ জানান, সিদ্ধান্ত বদল হবে না।

সরকার ছাড়ার সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘কিসের সভা! এমপিরা যাননি। সিনিয়র নেতারা যাননি। এটা একতরফা সভা। এ সভার কোনো সিদ্ধান্তের বৈধতা নেই।’ গতকাল প্রায় ২৬ মাস পর জাপার প্রেসিডিয়ামের সভা অনুষ্ঠিত হয়।
একাধিক প্রেসিডিয়াম সদস্য সমকালকে জানান, গতকালের সভায় রওশন সম্পর্কে এরশাদপন্থি কোনো নেতা রূঢ় মন্তব্য করেননি। এরশাদও ছিলেন নমনীয়। এরশাদ বলেন, ‘রওশনই আমাকে বলেছে কাদেরকে গড়ে তোলো। আমার সঙ্গে তার বিভেদ নেই। প্রতিটি কাজ রওশনকে জানিয়ে করি। সে মাঝে মাঝে অভিমান করে। এগুলো ঠিক হয়ে যাবে।’ জিএম কাদের সভায় বলেন, তিনিও বিরোধ চান না। রওশন তার মায়ের মতো।
প্রেসিডিয়াম সভায় হাবিবুর রহমান ছাড়া সবাই মন্ত্রিসভা ছাড়ার পক্ষে মত দেন। সরকার না ছাড়ার পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, ‘এ সিদ্ধান্ত নিলে মন্ত্রীরা রওশনকে নিয়ে নতুন জাতীয় পার্টি গঠন করবে। দল আবার ভাঙবে।’ অন্য সদস্যদের প্রতিবাদের মুখে হাবিবুর রহমানকে থামিয়ে দেন এরশাদ।

সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে রুহুল আমীন হাওলাদার জানান, আগামী ১৬ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জাপার জাতীয় সম্মেলন হবে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে জেলাভিত্তিক মনিটরিং সেল গঠন করা হবে। এরপর জেলা ও উপজেলা সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকদের নিয়ে যৌথ সভা করা হবে।
বিএনপিবিহীন বিগত সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছিলেন এরশাদ। ভাইয়ের পক্ষ নিয়ে নির্বাচন থেকে সরে যান জিএম কাদের। অধিকাংশ নেতা ভোট বর্জন করেন। এরশাদপত্নী রওশনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগপন্থি আনিসুল ইসলাম ও জিয়াউদ্দিন বাবলুর নেতৃত্বে একাংশ নির্বাচনে অংশ নেন। ৩৪ আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয় জাপা। বিরোধী দলের আসনে বসেও সরকারে যোগ দেয় তারা। মন্ত্রিসভায় তিনজন সদস্য রয়েছেন। এরশাদ মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হয়েছেন।
জাপাকে সত্যিকারের বিরোধী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে এক বছর ধরেই এরশাদ ও জিএম কাদের সরকার ছাড়ার কথা বলছেন। বিশেষ দূতের পদ ছাড়ার কথা বলছেন এরশাদ। তবে রওশনপন্থিরা সরকার ছাড়ার ঘোর বিরোধী। এ প্রশ্নে দীর্ঘদিন ধরেই দলে বিরোধ চলছে।
আবদুস সাত্তার, আবুল কাশেম, মাহবুবুর রহমানের মতো প্রবীণ নেতারা সভায় যোগ দিলেও শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা, জিয়াউদ্দিন বাবলু, কাজী ফিরোজ রশীদের মতো জ্যেষ্ঠ সদস্যরা সভায় উপস্থিত ছিলেন না।

 

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন