বেজোড় রাতে ‘লাইলাতুল কদর’

রমজান

সময় বাংলা, ধর্ম ও জীবন ডেস্ক:   মাহে রমজানের শেষ দশকের সবকটি বেজোড় রাতকেই লাইলাতুল কদর হিসেবে ধরা হয়। শবে কদর সন্ধানকারীকে রমজানের বেজোড় রাতে তা খোঁজ করতে বলেছেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ।

মূলত শবে কদর এমন রাত, যা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। সেই রাত কীভাবে সন্ধান করতে হবে সে সম্পর্কে হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর অসংখ্য হাদিস রয়েছে।

উম্মুল মুমেনিন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘তোমরা শেষ দশকের বেজোড় রাতে লাইলাতুল কদরের সন্ধান কর।’ (সহিহ বুখারী)

আরেক হাদিসে রমজানের শেষ সাত রাতে শবে কদর তালাশ করতে বলা হয়েছে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, বেশ কিছু সাহাবিকে রোজার শেষ সাত রাতে শবে কদর দেখানো হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, ‘আমি দেখছি তোমাদের স্বপ্ন শেষ সাত রাতে মিলে গেছে। এজন্য শবে কদরের সন্ধানকারী যেন সেটাকে শেষ সাত রাতে তালাশ করে।’ (সহিহ বুখারী)

রমজানের শেষ দশদিনের বেজোড় রাতের মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে কোন রাতটি শবে কদর তা নিয়ে বিশ্বনবী (সা.) এর হাদিসের উদ্বৃতি নিয়ে ফকিহ ও ইমামদের মধ্যে নানান মত রয়েছে। তার মধ্যে ইমামে আযম আবু হানিফা (র.) ও জমহুর ওলামাদের মতে, ২৭ রমজানই শবে কদর। (খাজায়েন আল কোরতবি ২০ খন্ড, ১৩৪ পৃষ্ঠা, রূহুল মায়ানি, ৩০ খন্ড, ২২০ পৃষ্ঠা)

তারা বলেন, প্রসিদ্ধ সাহাবি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.) দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, সাতাশ রমজানই শবে কদর। যেহেতু লাইলাতুল কদর (আরবীতে) নয় বর্ণ বিশিষ্ট, আর শব্দটি সূরা কদরের মধ্যে তিনবার এসেছে, যার সমষ্টি হচ্ছে সাতাশ। রমজানের এই সাতাশ রাতই শবে কদর। (তাফসিরে কবির ৩২খন্ড, ৩০পৃষ্ঠা)

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) ও গাউসে পাক শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী (র.) ২৭ রমজানের কথা বলেছেন। হযরত শাহ আবদুল আযিয মুহাদ্দিস দেহলভী (র.) তার তাফসিরে আযিযির ৪র্থ খন্ডে উল্লেখ করেন, শবে কদর ২৭ রাতে হয়ে থাকে। এ প্রসঙ্গে তিনি দুটি দলিল বর্ণনা করেন, এক, সূরা কদরে ত্রিশটি পদ রয়েছে। তার মধ্যে ২৭তম বর্ণ হচ্ছে আরবি পদটি, যা দ্বারা লাইলাতুল কদর বুঝানো হয়েছে। সূতরাং, আল্লাহর পক্ষ থেকে নেককার লোকদের জন্য এ ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, রমজানের ২৭ রাতেই শবে কদর।

দুই, লাইলাতুল কদর শব্দ দুটিতে মোট বর্ণ রয়েছে ৯টি। আর শব্দ দুটি এই সুরায় তিনবার এসেছে। এভাবে তিনকে নয় দিয়ে গুণ করলে গুণফল হয় ২৭। এতে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে ২৭ রমজানের রাতই লাইলাতুল কদর।

তাফসিরে রুহুল বয়ানে ২৭ রমজান শবে কদরের সমর্থনে একটি ঘটনার বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত ওসমান ইবনে আবিল আস (রা.) এর ক্রিতদাস তাঁর কাছে আরয করলেন, হে মুনিব! নৌকা চালাতে চালাতে আমার জীবনের একটি অংশ অতিবাহিত হয়েছে। আমি সমুদ্রের পানিতে একটি অবাক বিষয় লক্ষ্য করেছি। তখন মুনিব বললেন -কী? গোলাম আরয করলেন, হে মুনিব, প্রতিবছর এমন একটি রাতও আসে, যাতে সমুদ্রের পানি মিষ্টি হয়ে যায়। একথা শুনে তিনি গোলামকে বললেন, এবার বিষয়টি খেয়াল করবে, যখনই পানি মিষ্টি মনে হবে আমাকে জানাবে। যখন রমজানের ২৭তম রাত আসলো তখন মুনিবকে তার গোলাম জানালেন, হে মুনিব আজ সমুদ্রের পানি মিষ্টি হয়ে গেছে। (রুহুল বয়ান, ১০ম খন্ড, ৪৮১পৃষ্ঠা)

আরেক হাদিসে আছে, হযরত ইবন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, লাইলাতুল কদর শেষ দশকে, তা অতিবাহিত হয় নবম রাতে অথবা অবশিষ্ট সপ্তম রাতে। (সহিহ বুখারী)

শবে কদর নিয়ে শরীয়তের অন্যান্য ইমামরাও ভিন্ন মত দিয়েছেন। হযরত ইমাম শাফেয়ী (র.) এর মতে, রমজানের ২১তম রাতই শবে কদর। (ফতহুল বারী)

হযরত ইমাম মালেক বিন আনস, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল ও হযরত সুফিয়ান সওরি (র.) প্রমুখদের মতে, শবে কদর নির্দিষ্ট কোনো এক তারিখে হয় না। বরং রমজানের শেষ দশকের রাতে ঘুরতে থাকে। (তাফসির সাভি)

মোট কথা রমজানের বেজোড় রাতে শবে কদর। মহিমান্বিত এ রাতের বেশ কিছু নিদর্শন রয়েছে। হাদিসে আছে, সাহাবি হযরত ওবাদাহ ইবনে সামিত (রা.) রাহমাতুল্লিল আলামিনের কাছে শবে কদর সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তখন আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন, শবে কদর রমজানের বেজোড় রাতে হয়ে থাকে। তাই যে কেউ ঈমান সহকারে সওয়াবে নিয়্যতে এই রাতগুলোতে এবাদত করবে তার সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।

তিনি (রাসূল সা.) বলেন, শবে কদর বুঝার জন্য এটাও রয়েছে যে, ওই মোবারক রাত সুস্পষ্ট, পরিষ্কার ও স্বচ্ছ হবে। এটি না গরম, না বেশি ঠান্ডা বরং এ রাত মাঝারি তাপমাত্রার হয়ে থাকে। এমন মনে হবে, যেন রাতে চাঁদ খোলাখুলিভাবে উদিত। এ পূণ্য রাতে শয়তানদের আসমানে ছুঁড়ে মারা হয়।

আরো নিদর্শনের মধ্যে আছে, এ রাত অতিবাহিত হওয়ার পর যখন ভোর আসে তখন সূর্য আলোকরশ্মি ছাড়াই উদিত হয়, আর তা এমন হয় যেন ১৪ তারিখের চাঁদ। আল্লাহপাক ওই দিন সূর্যোদয়ের সঙ্গে শয়তানকে বের হতে বাঁধা দেন। মুসনাদে ইমাম আহমদ, ৮ম খন্ড, ৪১৪ পৃষ্ঠা, হাদিস- ২২৮২৯)।

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন