ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থে বিচার বিভাগের গলা টিপে ধরবেন না: ডক্টর তুহিন মালিক

সময় বাংলা রিপোর্ট: নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিধিমালা নিয়ে নানা টালবাহানা ও ২৫ বার সময় নিয়ে শেষ পর্যন্ত সরকার বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের মৃত্যু ঘটিয়ে গেজেট প্রকাশ করলো! যা শুধুমাত্র মাজদার হোসেন মামলায় বিচার বিভাগ পৃথকীকরণে সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশনার পরিপন্থী নয়, বরং সংবিধানের ২২ নম্বর অনুচ্ছেদেরও পরিপন্থী।

এই গেজেট জারীর মাধ্যমে নিম্ন আদালতের বিচারকগণ সম্পূর্ণভাবে সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলো। বিচার বিভাগ যে একটি পৃথক প্রতিষ্ঠান, এই ধারনাটি এখন শুধুই কল্পনার জগতের এক অলীক মোহ মাত্র!

সরকারি কর্মচারীদের জন্য যে বিধি প্রযোজ্য, এখন থেকে বিচারকদের জন্যও সেই একই বিধি প্রযোজ্য! অথচ সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ও জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশনের অধীনে এটা হবার কথা ছিল। কিন্তু জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশনকে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়ে নেয়া হলো! আর এখন দেশের সকল বিচারকদের নিয়ন্ত্রক হচ্ছেন আইন মন্ত্রনালয়-আইনমন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী এবং কার্যত সরকারী দল (যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন)।

আমাদের সংবিধানে যে ক্ষমতা রাষ্ট্রপতিকে দেয়া হয়েছে সেটা এখন রাষ্ট্রপতির পরিবর্তে আইন মন্ত্রণালয়ের হাতেও চলে গেলো!

সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা নিম্ন আদালত পরিদর্শনের সময় অনিয়ম, অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিতে পারতেন। কিন্তু এখন থেকে ‘উপযুক্ত কর্তৃপক্ষই’ এই ব্যবস্থা নিতে পারবে। অর্থাৎ অভিযুক্ত বিচারকদের দণ্ড দেওয়া থেকে শুরু করে সব ক্ষমতাই এখন ‘উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের’। আর এই ‘উপযুক্ত কর্তৃপক্ষটি’ হচ্ছেন আইন মন্ত্রণালয়!

সরকারের এইসব হটকারীমূলক নিয়ন্ত্রণ চেষ্টার কারণে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার সময় মন্ত্রণালয়ে খসড়া বিধিমালা ফেরত দেওয়া হয়েছিল। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের আলোকে নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে রেখে বিধিমালার খসড়া চূড়ান্ত করে তা সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করেছিল আইন মন্ত্রণালয়। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগ রাষ্ট্রপতির বদলে সুপ্রিম কোর্টের হাতে ক্ষমতা নেওয়ার প্রস্তাব করে খসড়াটি সংশোধন করে দিয়েছিলেন। ওই প্রস্তাব অনুযায়ী গেজেট প্রকাশ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল আইন মন্ত্রণালয়কে। কিন্তু সরকার সেটা না করে বারবার সময় নিতে থাকে। একপর্যায়ে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর রায়ে সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিরুদ্ধে নানাবিধ অভিযোগ এনে তাকে দেশান্তরে পাঠিয়ে গতকাল এই বিতর্কিত গেজেট প্রকাশ করে সরকার।

আগামীকাল সকালে এটর্ণী জেনারেল সুপ্রিম কোর্টের ফুল বেঞ্চে সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক এই বিতর্কিত গেজেটটি জমা দিবেন বলে জানা গেছে। আমাদের সবাইকেই মনে রাখতে হবে, আজ আমরা আছি, কালকে নাই। কিন্তু দেশটা থাকবে ইনশাআল্লাহ। বিচার বিভাগও থাকবে। বিচারপতি, আইনজীবী, আইনমন্ত্রী- সবই থাকবে। সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি বিনীতভাবে অনুরোধ, ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থে বিচার বিভাগের গলা টিপে ধরবেন না।

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন