মাহে রমজানের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

4e004025767319b4f2c68cf52e3be825সময় বাংলা, ধর্ম ও জীবন ডেস্ক:  সময়কে ঘিরে জীবনের প্রত্যাশা নতুন নয়। প্রত্যাশা থাকে ঈদে, জন্মদিনে, বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানাদিতে। মানুষের বৈষয়িক প্রত্যাশা থাকে মা-বাবার কাছে, বড় ভাইয়ের কাছে অথবা অন্য কারো কাছে।

প্রাপ্তির আশা পূরণ হলে মানুষ আনন্দিত হয় আর অপূরণ থেকে গেলে ব্যথিত হয়। আর বঞ্চনার জ্বালা সে বয়ে বেড়ায় বহু দিন। তারপর ভুলে যায় সব না-পাওয়ার স্মৃতি। তবে সময়কে ঘিরে পরকালীন প্রত্যাশাটাই জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়ার আশা।

যে আশা পূর্ণ হওয়ার আনন্দ মানুষ চিত্কার করে অন্যকে জানাবে আর অপূর্ণতার জ্বালা সে ভোগ করবে অনন্তকাল ধরে। ইরশাদ হয়েছে, ‘অতঃপর যার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে, সে বলবে—নাও, তোমরা আমার আমলনামা পড়ে দেখো। আমি জানতাম, আমাকে হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে।

অতঃপর সে কাঙ্ক্ষিত সুখী জীবন যাপন করবে সুউচ্চ জান্নাতে। তার ফলগুলো থাকবে অবনমিত। (তাদের বলা হবে) তোমরা বিগত দিনে যা প্রেরণ করেছিলে, তার প্রতিদানে তৃপ্তিসহকারে খাও এবং পান করো। আর যার আমলনামা বাঁ হাতে দেওয়া হবে, সে বলবে—‘হায়! আমাকে যদি আমলনামা দেওয়া না হতো।

আমি যদি জানতেই না পারতাম আমার হিসাব! মুত্যুই যদি হতো আমার শেষ পরিণতি! (আফসোস!) আমার ধনসম্পদ আমার কোনো কাজে এলো না! আমার ক্ষমতা শেষ হয়ে গেল।’ (সুরা : আল-হাক্কাহ, আয়াত : ১৯-২৯) অনন্ত জীবনের প্রত্যাশা পূরণের এক মহান সুযোগ নিয়ে আমাদের মধ্যে এসেছিল মাহে রমজান।

মহাকালের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়টি বিদায়ের পথে। আজ মোবারক মাসটির শেষ জুমা। বছর ঘুরে আবার মহাকালের এই মাহেন্দ্রক্ষণের সাক্ষাত্ মিলবে—এমন নিশ্চয়তা আমাদের কারোরই নেই। তাই এখনই সময় প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির হিসাবটা একটু মিলিয়ে দেখার। যদি কিনা সঞ্চয়ের ডালাটা একটু ভরে নেওয়া যায়! ব্যক্তিগত পর্যায়ে মহান আল্লাহর কিছু নেক বান্দা এমন আছেন, যাঁদের প্রাপ্তিটা ষোলআনায় ভরপুর—সন্দেহ নেই। আর তাঁদের কারণেই আজও পৃথিবীটা টিকে আছে।

প্রাপ্তি আর বঞ্চনার হিসাবটা তাঁদের কাছে থোড়াই গুরুত্ব পায়। মাওলার মর্জি পূরণ করাটাই তাঁদের বেঁচে থাকার আসল অবলম্বন। কিন্তু আমরা যারা জীবনের অনিশ্চিত জীবন ও গন্তব্যকে আসল ভেবে আঁকড়ে আছি, তাদের জন্য হিসাবটা বেশ জরুরি। আসলে রমজানকে কেন্দ্র করে আমাদের পাওয়ার কী ছিল আর কী পেয়েছি—সেই হিসাবটা এখন খুবই প্রয়োজন। তাকওয়া : তাকওয়াই রমজানকেন্দ্রিক মুমিনের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

কারণ এর জন্যই মহান আল্লাহ রমজানের রোজাকে ফরজ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা আল-বাকারা : ১৮৩) তাকওয়া আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ ভয় করা, আত্মরক্ষা করা, বিরত থাকা, বেঁচে থাকা। পরিভাষায় মহান আল্লাহর ও জাহান্নামের শাস্তির ভয়ে সব ধরনের পাপাচার থেকে বিরত থাকার নাম তাকওয়া। অর্থাত্ মুমিনের জীবনে আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার নাম তাকওয়া।

মাহে রমজানে যখন সংবাদমাধ্যমগুলো হত্যা-ধর্ষণের সংবাদ নিয়মিত প্রকাশ করছে, রোজাদার সরকারি চাকুরে যখন ইফতারি আর ঈদ খরচের কথা বলে সেবাপ্রার্থীদের কাছ থেকে অবৈধ উেকাচ আদায় করছে, বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সরকারের বারবার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণের বাইরেই থেকে গেছে, জনজীবনের নিরাপত্তার দায়ভার কাঁধে নিয়েও যখন বিশেষ বাহিনীর লোকেরা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টিতে তত্পরতা চালাচ্ছে, তখন মাহে রমজানের শ্রেষ্ঠ প্রত্যাশাটি আমাদের অপূর্ণই রয়ে গেল বলতে দ্বিধা নেই।

রহমত, মাগফিরাত, জাহান্নাম থেকে মুক্তি : রাসুলে কারিম (সা.) এক হাদিসে বলেছেন : রমজান এমন একটি মাস, যার প্রথম ১০ দিন রহমতের আর দ্বিতীয় ১০ দিন মাগফিরাতের ও তৃতীয় ১০ দিন জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য। (সহিহ ইবনে খুজাইমা, খণ্ড : ৩, পৃষ্ঠা : ১৯১, হাদিস : ১৮৮৭) রমজান মাস এলেই মহান আল্লাহ নিঃশর্তভাবে সবাইকে রহমত দান করবেন, মাগফিরাত দান করবেন আর জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করবেন বিষয়টি তেমন নয়।

বরং আল্লাহর রহমত শুধুই সত্কর্মশীলদের জন্য। ইরশাদ হয়েছে, ‘পৃথিবীকে সংশোধিত করার পর তোমরা তাতে বিপর্যয় সৃষ্টি কোরো না আর আল্লাহকে ডাকো ভয় ও আশা নিয়ে। নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত সত্কর্মশীলদের খুব নিকটে।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৫৬) সুতরাং অপকর্ম আর পাপাচার নিয়ে আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশা, অধিকারবিহীন কামনা ছাড়া অন্য কিছু নয়। গুনাহর জন্য ক্ষমা লাভেরও তো যোগ্যতা চাই।

মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘বলো, হে আমার বান্দারা! তোমরা যারা পাপাচার করে নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। তিনি পরম ক্ষমাশীল, অসীম দয়ালু। তোমরা তোমাদের পালনকর্তার অভিমুখী হও এবং পুরোপুরি তাঁর অনুগত হও, তোমাদের কাছে আজাব এসে যাওয়ার আগে। আজাব এসে গেলে তোমরা আর সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না।’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৫৩-৫৪ ) উদ্ধৃত আয়াতের বক্তব্য খুবই স্পষ্ট। গুনাহ করার পর পুরোপুরি অনুতপ্ত না হলে এবং মহান আল্লাহর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হতে না পারলে তার জন্য কোনো ক্ষমা নেই। আর জাহান্নাম থেকে মুক্তি, সেটা শুধু প্রত্যাশায় হাসিল হওয়ার বিষয় নয়।

সে জন্য আল্লাহর রোষানল থেকে বেঁচে থাকা জরুরি। ইরশাদ হয়েছে, ‘যে আল্লাহর ইচ্ছার অনুগত হয়েছে, সে কি ওই লোকের সমান হতে পারে, যে আল্লাহর রোষানলে পতিত হয়েছে? বস্তুত তার ঠিকানা তো জাহান্নাম। আর তা কতই না নিকৃষ্ট আবাসস্থল!’ (সুরা আলে ইমরান : ১৬২) আল্লাহর অবাধ্য জীবনকে রোজা জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রোজা জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য ঢালস্বরূপ, যতক্ষণ না তাকে ফেড়ে ফেলা হয়।’ (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক : ৭৮৯৫, আস-সুনানুল কুবরা : ২৫৫৫, সুনান আন-নাসাই : ২২৩৫, তারগিবুল আমানি : ১৮৬৭) হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত অন্য এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রোজা ঢালস্বরূপ। সুতরাং তোমাদের কেউ যখন রোজা রাখবে, সে পাপাচার করবে না এবং অজ্ঞদের মতো আচরণ করবে না।’

(মুআত্তা ইমাম মালেক : ১০৯৯, মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক : ৭৪৪৩, মুসনাদে আহমাদ : ৭৪৯২) সুতরাং পাপাচারের কলুষতা থেকে মুক্ত হয়ে খোদানুগত্যের নির্মল ধারায় নিজেকে যুক্ত করতে না পারলে আল্লাহর রহমত, মাগফিরাত আর জাহান্নাম থেকে মুক্তি—কোনোটাই আশা করা যায় না। তবে হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। হতাশা মুমিনের জন্য একেবারেই বেমানান। এখনো মোবারক মাস রমজানের কয়েকটি দিন বাকি আছে। তাওবা করলে অবশ্যই মহান আল্লাহ ক্ষমা করবেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনি বান্দাদের তাওবা কবুল করেন, পাপগুলো ক্ষমা করেন এবং তোমাদের কৃত সব বিষয় সম্পর্কে তিনি অবগত রয়েছেন।’ (সুরা : শুরা, আয়াত : ২৫) মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত মহান আল্লাহ বান্দার জন্য তাওবার দরজা খোলা রেখেছেন। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পশ্চিম আকাশে সূর্য উদয়ের আগ পর্যন্ত তাওবার দরজা বন্ধ হবে না।’ (মুসনাদে আহমাদ : ১৬৯০৬) তবে তাওবা হতে হবে অনুতপ্ত হূদয়ের গভীর অনুরণন। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করবেন, যারা ভুলবশত মন্দ কাজ করে অতঃপর অনতিবিলম্বে তাওবা করে; এরা হলো ওই সব লোক, যাদের আল্লাহ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’

(সুরা : আন-নিসা, আয়াত : ১৭) মহান আল্লাহর অনুগ্রহকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করে অতীত জীবনের পাপের কলুষ থেকে মুক্ত হয়ে জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জান্নাতের অধিকার লাভের জন্য এখনো মাহে রমজানের দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাত অবশিষ্ট আছে। ২৭ ও ২৯ রমজানের রাতে খাঁটিভাবে তাওবা করে, ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে সেই অধিকারটা লাভের জন্য বিশেষ তত্পর হওয়াই এখন রমজানের প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির ফলাফল মিলানোর শেষ সুযোগ। অবশিষ্ট রাত দুটির যেকোনো একটি কদরের রাত হলেও হতে পারে। হজরত আয়েশা (রা.) একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন।

তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা রমজান মাসের শেষ ১০ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করো।’ (সহিহ বুখারি : ২০১৭, মুসনাদে আহমাদ : ২৪৪৪৪, সুনানুস সাগির : ১৪০১, বায়হাকি—শুআবুল ইমান : ৩৩৯৯, শারহুস সুন্নাহ : ১৮২৩)

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন