‘যখন নির্বাচন দিলে বিজয়ী হবো, তখনই দেবো’

সময় বাংলা ডেস্ক: ‘যখন নির্বাচন দিলে আমরা বিজয়ী হতে পারবো, তখনই দেবো’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এমন বক্তব্য সম্বলিত একটি নিউজের স্ক্রীনসট ফেসবুকে প্রায়ই চোখে পড়ে। প্রথম আলো পত্রিকার এই স্ক্রীনসটটি ১৯৯৯ সালের ২৭ তারিখের। স্ক্রীনসটটির সত্যতা জানা না গেলেও স্থগিত হয়ে যাওয়া ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচনের সাথে যেনো ১৮ বছর আগের এই শিরোনামটি হুবহু মিলে যাচ্ছে। তাইতো রাজনীতি সচেতন রসিক ফেসবুকাররা এই স্ক্রীনসটটি নতুন করে আবার সামনে নিয়ে এসেছেন।

নির্বাচন কমিশন কর্তৃক তফসিল ও নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা এবং দুই বড় দলই তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করার পর হঠাৎ করেই আদালত কর্তৃক বহুল আলোচিত ডিএনসিসি নির্বাচন স্থাগিত হয়ে গেলো। সরকারি দল ছাড়া প্রায় সকলেই আদালতের এই স্থগিতাদেশকে সরকারের চাওয়ার প্রতিফলন হিসেবেই দেখছেন। তাদের বক্তব্য অনেকটা ১৯৯৯ সালের সেই শিরোনামটির মতই।

বিএনপি বলছে, নির্বাচনে ভরাডুবির ভয়ে সরকারই নিজেদের লোক দিয়ে করিয়েছে। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, “কী সুন্দর খেলা! সরকার যখন বুঝতে পেরেছে যে উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র উপ-নির্বাচনে তাদের ভরাডুবি হবে, তখন কোর্টে নিজেদের লোক দিয়ে রিট করিয়ে নির্বাচন স্থগিত করে দেওয়া হয়েছে।”

বিশ্লেষকরাও বলছেন, সরকার নিজেই চায় না ডিএনসিসিতে এখনই নির্বাচন হোক। তাদের মতে, বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ জানতে পেরেছে ডিএনসিসি উপনির্বাচনে তারা কোনোভাবেই জয়ী হতে পারবে না। ঢাকাতে কখনোই তাদের অবস্থা ভালো ছিলো না, এখনো নেই। গত ২০১৫ সালের ঢাকা সিটি নির্বাচনে কেন্দ্র দখল, কারচুপি আর জালিয়াতি করে নিজ দলের প্রার্থীদেরকে বিজয়ী করলেও এবার আর সেরকম কিছু করতে চাইছে না বা করতে পারছেনা সরকার।

এর কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার জাতীয় নির্বাচনের আগে চাইছে না কোনো বিতর্কিত নির্বাচন করতে। সরকার চাচ্ছে একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে রংপুর সিটির মত কিছু সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে জনগনকে আস্বস্ত করতে যে তারা ক্ষমতায় থাকলেও সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব। এটা শুধু দেশের মানুষকেই দেখাতে চাচ্ছেনা, এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মহলকেও আস্বস্ত করতে চাচ্ছে সরকার।

বিশ্লেষকরা আরো বলছেন, সুষ্ঠু নির্বাচন দেখানোর পাশাপাশি সরকার কোনোভাবেই রাজধানী ঢাকাকে তাদের হাতছাড়া করতে চাচ্ছে না। কারণ, আগামী সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বিরোধী দলের আন্দোলনে রাজধানী ঢাকাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায় সরকার। যেমনটা নিয়ন্ত্রণে রেখেছে বিরোধী দলগুলোর বিগত আন্দোলনগুলোর সময়। কিন্তু ঢাকা উত্তর সিটির নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী বিজয়ী হলে রাজধানীকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সরকারের পক্ষে সহজ নাও হতে পারে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেছেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে সরকার জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের কোন ঝুঁকি নিতে চাইছে না। এজন্য জটিলতাগুলো দূর না করেই নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে তফসিল ঘোষণা করিয়েছিল। এর মাধ্যমে এটাও প্রমাণ হয় যে, নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না। পরিস্থিতির পেছনে সরকারের ভূমিকা আছে। কারণ নির্বাচনে হার নিশ্চিত জেনে সরকার একটা সুযোগ নিয়েছে।”

জাতীয় নির্বাচনের এক বছরেরও কম সময় বাকি থাকতে ঢাকা সিটি করপোরেশনের মত একটি স্পর্শকাতর জায়গায় ভোট করার ঝুঁকি আওয়ামী লীগ নেবে কি না- তা নিয়ে গুঞ্জন চলছিল বেশ কিছুদিন ধরেই। এর মধ্যে বেরাইদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাড্ডা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম নির্বাচন আটকাতে রিট করলে সেই গুঞ্জন নতুন মাত্রা পায়।

এদিকে আদালতের স্থগিতাদেশের পর নির্বাচনী কার্যক্রম স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, শিগগির এই উপ-নির্বাচন আয়োজনে মন্ত্রণালয়ের কোনো সহযোগিতা করার থাকলে নির্বাচন কমিশনকে তা দেওয়া হবে। নির্বাচনে বিলম্ব হলেও সমস্যা হবেনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “নির্বাচিত মেয়রের কাজটা চালানোর জন্য প্যানেল মেয়র দায়িত্ব পালন করবেন, উনার অবর্তমানে দ্বিতীয় যিনি আছে তিনি করবেন, তার অবর্তমানে তৃতীয়জন করবেন। … কোনো অচলাবস্থার সৃষ্টি হবে না, কোনো ভ্যাকুয়াম থাকবে না।”

জানা যায়, গত ৯ বছরে সরকারের গুম, খুন, অপহরণ, হামলা-মামলা এবং আর্থিক খাতে বিশেষ করে শেয়ার বাজার ও ব্যাংকগুলোতে লুটপাটের কারনে সরকারের ভাবমূর্তি এখন যেকোনো সময়ের চাইতে খারাপ অবস্থায় আছে। এছাড়া হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও গুম অপহরণের ভয়ংকর চিত্র তুলে ধরে বাংলাদেশকে অনিরাপদ দেশ হিসেবে তুলে ধরেছেন। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক মহলকে খুশি করতে হলেও জাতীয় নির্বাচনের আগের স্থানীয় নির্বাচনগুলোকে সরকার কোনোভাবেই বিতর্কিত করতে চায় না।

‘যখন নির্বাচন দিলে আমরা বিজয়ী হবো, তখনই দিবো’ এই বক্তব্যটি ডিএনসিসির ক্ষেত্রে সরাসরি না ফললেও পরোক্ষভাবে সেটাই। কারণ, সরকার চাচ্ছে এখানে অবশ্যই জয়লাভ করতে। আবার জয়লাভ করতে গিয়ে নির্বাচনে কারচুপিও করতে চাচ্ছেনা। আর কারচুপি ছাড়া জয়ের সম্ভাবনাও নেই। তাই তারা চাইছে না এখনই নির্বাচন হোক। সেই চাওয়া থেকেই আদালতকে ব্যবহার করে নির্বাচনে স্থগিতাদেশ। অর্থাৎ ‘এখন বিজয়ী হবো না, তাই এখন নির্বাচন নয়’। যেনো স্ক্রীনসটের সেই শিরোনামেরই প্রতিচ্ছবি!

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন

এ বিভাগের আরো খবর