রক্ষক যখন ভক্ষক

সময় বাংলা ডেস্ক: পান্থপথের বাসা থেকে মরিয়ম আক্তার ইকোকে গত বছরের ১৪ জুলাই তুলে নিয়ে যান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মিজানুর রহমান। তিনি ১৭ জুলাই ইকোকে বিয়ে করলেও তা গোপন রাখেন। বিভিন্ন সময় তাকে মারধরও করেন মিজান। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারের করা মামলায় ইকোকে কারাভোগ করতে হয়। সম্প্রতি মুখ খুলেছেন ইকো। তার মুখে রোমহর্ষক বর্ণনা শুনে শিউরে উঠছে দেশবাসী।

গত বছরের ২৫ অক্টোবরে কক্সবাজারের টেকনাফে ১৭ লাখ টাকাসহ ডিবি পুলিশের সাত সদস্য গ্রেফতার হয়। অন্যদিকে ফরিদপুর জেলা পুলিশ সুপার সুভাষ সিংহ রায়ের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে ৮ কোটি টাকা অর্জনের অভিযোগ উঠেছে।

গত বছরের নভেম্বরে যশোরের কেশবপুর উপজেলায় গভীর রাতে তল্লাশির নামে এক বাড়িতে ঢুকে টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার লুট করার অভিযোগ ওঠে পুলিশের পাঁচ সদস্যসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে। সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগকারী আয়েশা জানিয়েছিলেন, মামলা করায় পুলিশের তরফ থেকে অহরহ হুমকি দেয়া হচ্ছে তাকে। এমন আরও অনেক অভিযোগ প্রতিনিয়তই উঠে আসছে সংবাদমাধ্যমগুলোয়।

এ ঘটনাগুলোই প্রমাণ করে ‘সাধারণ মানুষের বন্ধু পুলিশ’- দেশের প্রেক্ষাপটে কথাটি আংশিক সত্য। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রক্ষক অবতীর্ণ হয় ভক্ষকের ভূমিকায়। তাদের অপকর্মের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে ক্রমাগত। প্রতিদিন পুলিশের বিরুদ্ধে হাজারো অভিযোগ জমা পড়ে পুলিশ সদর দফতরের সিকিউরিটি সেলে। এসব অভিযোগের বেশিরভাগই কনস্টেবল থেকে ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার পুলিশের বিরুদ্ধে। গত বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১৫ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়েছে সিকিউরিটি সেলে।

এএসপি থেকে তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তদন্ত হয়।

প্রাথমিকভাবে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা-১৯৮৫ অনুযায়ী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে তদন্ত করে পুলিশ সদর দপ্তর। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত সদস্যদের নামমাত্র শাস্তি দেয়া হয়। অনেক সময় অল্প সময়ের জন্য সাময়িক বরখাস্ত করে আবারও কর্মক্ষেত্রে বহাল করা হয় অভিযুক্তদের। বিশ্লেষকরা বলছেন, পুলিশ সদর দপ্তর অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ায় বেড়েই চলেছে অপরাধ প্রবণতা।

প্রতি মাসেই শতাধিক অভিযোগ জমা পড়ে জেলা পর্যায়ের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে। এসব অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠন হলেও বেশিরভাগের নিষ্পত্তি হচ্ছে না।

পুলিশ সদর দপ্তরে একজন উপ-মহাপরিদর্শকের (ডিআইজি) তত্ত্বাবধানে গত ১৪ নভেম্বর ২৪ ঘণ্টার জন্য ‘আইজিপি`স কমপ্লেইন সেল‘ চালু করা হয়। পুলিশের যে কোনো রকম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের শিকার হয়ে সাধারণ মানুষ এখানে ফোন, ই-মেইল, ডাকযোগে বা সরাসরি অভিযোগ দিতে পারেন। এখন পর্যন্ত থানায় গিয়ে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে সবচেয়ে বেশি। অন্য অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে- গাড়ি আটক করে ট্রাফিক সদস্যদের টাকা আদায়, মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়সহ আরও অনেক কিছু।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষও পুলিশ সদস্যদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির বিষয়টি স্বীকার করেন। এ বিষয়ে সম্প্রতি পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক বলেন, দেশে পুলিশের বিরুদ্ধে অনেকেরই অভিযোগ থাকে। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে বাংলাদেশের পুলিশ বিগত দিনগুলোর তুলনায় অনেক বেশি তৎপর বলে জানিয়েছেন তিনি। পুলিশ সপ্তাহ সামনে রেখে শনিবার (৬ জানুয়ারি) দুপুরে পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আইজিপি এ তথ্য জানান।

পুলিশ প্রধান বলেন, ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সংঘটিত ডাকাতি, দস্যুতা, খুন ইত্যাদি অপরাধ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এসব ঘটনার প্রত্যেকটিতে মামলা হয়েছে এবং পুলিশ প্রায় প্রতিটি ঘটনার রহস্য উদঘাটন করে প্রকৃত আসামি গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে।

আইজিপি বলেন, গত বছর অস্ত্র, বিস্ফোরক দ্রব্য, মাদক দ্রব্য ও চোরাচালানের ঘটনায় উদ্ধারজনিত কারণে মোট মামলা হয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ১৫৩টি। এর মধ্যে অস্ত্র আইনে ২ হাজার ২০৮, বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে ৩৬২, মাদকদ্রব্য আইনে ৯৮ হাজার ৯৮৪, চোরাচালান দ্রব্য আইনে ৫ হাজার ৫৯৯টি। এসব মামলায় ১ লাখ ১৫ হাজার ৫২৮ জন গ্রেফতার হয়েছে।

একেএম শহীদুল হক বলেন, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূলে পুলিশ বাহিনী ব্যাপক সফলতা দেখিয়েছে। জঙ্গি দমনে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ আজ রোল মডেল।

আইজিপি বলেন, দেশে ৩৫টিরও বেশি জঙ্গি আস্তানা চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গুড়িয়ে দিয়েছে। এসব ঘটনায় অনেক জঙ্গি সদস্য নিজেরাই আত্মহুতি দিয়েছে এবং অনেকে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মারা গেছে। সারাদেশে অন্তত ৫৮ জন জঙ্গি সদস্য মারা গেছে এবং শতাধিক জঙ্গি সদস্য পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছে।

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন

এ বিভাগের আরো খবর