রাষ্ট্রীয় খরচে প্রধানমন্ত্রীর গণসংবর্ধনা ‘দলীয় ব্যানারে’ কেন ?

মাঈনুল ইসলাম নাসিম : বাংলাদেশের রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান বিদেশে যেখানেই যাবেন, সেখানকার স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশীরা তাঁকে স্বাগত জানাবে বা গণসংবর্ধনা দেবে এটাই স্বাভাবিক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেহেতু একাধারে একটি রাজনৈতিক দলেরও প্রধান, তাই যৌক্তিক কারনে বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিকদের বাড়তি উৎসাহ উদ্দীপনা থাকবে, এটাও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু বিদেশে আয়োজিত এই গণসংবর্ধনার যাবতীয় খরচাদি যেহেতু সংশ্লিষ্ট দেশের স্থানীয় বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকেই বহন করতে হয়, সেহেতু উক্ত গণসংবর্ধনা রাজনৈতিক ব্যানারে আয়োজন করা নৈতিকতার মাপকাঠিতে কতটা যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য, এই প্রশ্ন পুরনো হলেও নতুন করে সামনে আসছে আজ।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সরকারী অর্থে বিভিন্ন দেশে আয়োজিত প্রধানমন্ত্রীর গণসংবর্ধনায় দলীয় পরিচয়ের মুখচেনা লোকজনের বাইরে তেমন কারো অংশগ্রহনের সুযোগ একেবারেই সীমিত। আগে থেকেই তালিকাভুক্ত দলীয় লোকজনরাই গণসংবর্ধনায় যোগ দেবার সুযোগ পায় এবং সেই দলীয় লোকদের সামনেই সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ড বর্ণনা করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, সফরের আগে ফলাও করে প্রচার করা হয় অমুক দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের দেয়া সংবর্ধনা তথা কমিউনিটির একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু বাস্তবে দিনশেষে তিনি যোগ দেন বিভিন্ন দেশ থেকে জড়ো হওয়া খুবই ‘লিমিটেড এন্ড লিস্টেড’ কয়েকশ’ দলীয় লোকের সমাবেশে।

প্রধানমন্ত্রীর গণসংবর্ধনায় প্রবেশের তালিকাটি যারা তৈরী করে তারা প্রায়শই বিভিন্ন কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে থাকে নিজেদের অস্তিত্ব ঠিক রাখতে। বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীদের নাম তালিকায় না থাকাই স্বাভাবিক কিন্তু দেখা যাচ্ছে, সরাসরি আওয়ামী লীগ না করার ‘অপরাধে’ বিভিন্ন দেশে সমাজের অনেক দলনিরপেক্ষ সুধীজন এবং ত্যাগী কমিউনিটি ব্যক্তিত্বদের সুকৌশলে ঠেকিয়ে দেয়া হয় প্রধানমন্ত্রীর গণসংবর্ধনায় যোগদানে। আর এই অপকর্মটি করছে সরকারী দলের নাম ভাঙ্গানো গুটিকয়েক ‘ভিলেজ পলিটিশিয়ান’, যাদের দাপটে অনেকটা অসহায় সরকারী চাকরি করা দূতাবাসের কর্তাব্যক্তিরা। বিভিন্ন দেশে মেইনস্ট্রিমে আকাশচুম্বী সাফল্যের অধিকারী তথা বিভিন্ন সেক্টরে ‘ডমিনেট’ করা বাংলাদেশের ‘সোনার সন্তান’ অনেক জ্ঞানীগুণী লোকজনরা প্রধানমন্ত্রীর কাছাকাছি আসার কিংবা গণসংবর্ধনায় যোগ দেবার সুযোগ পান না এই ভিলেজ পলিটিশিয়ানদের কারনে।

সম্পূর্ণ সরকারী খরচে বিদেশের মাটিতে যে দলীয় রাজনৈতিক ব্যানারে প্রধানমন্ত্রীর গণসংবর্ধনা আয়োজন করা হচ্ছে, সেসকল রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের কোন আইনগত বৈধতা বাংলাদেশের বাইরে পৃথিবীর অন্য কোন দেশে নেই। পৃথিবীর কোন দেশই তার দেশের অভ্যন্তরে ভিনদেশী কোন রাজনৈতিক দল বা দলের কর্মকান্ডকে অনুমোদন করে না বা করার সুযোগও নেই। কেউ করলে অবশ্যই সেটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ সংশ্লিষ্ট দেশের প্রচলিত আইনে। সঙ্গত কারনে বাংলাদেশ ভিত্তিক যে কোন রাজনৈতিক দলের ন্যূনতম কোন আইনগত বৈধতা বিদেশের কোথাও নেই।

ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে, হাতে গোনা কিছু দেশে আমাদের দেশের লোকজন তাদের রাজনৈতিক সংগঠনকে বিভিন্ন দেশে ‘প্রতারণামূলক’ রেজিস্ট্রেশন করিয়েছে স্থানীয় প্রশাসনের খাতায় সামাজিক বা সাংস্কৃতিক সংগঠন দেখিয়ে। “রাজনৈতিক সংগঠনের নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রেশন আছে” এমনটা যারা দাবী করে বিভিন্ন দেশে, অফিসিয়ালি খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে তারা প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে যে রেজিস্ট্রেশন নাম্বার নিয়েছে সেটা নামে ও কাজে ‘রাজনৈতিক সংগঠন’, কিন্তু তাদের নিবন্ধনের ক্যাটাগরি হচ্ছে সামাজিক বা সাংস্কৃতিক। আইনের দৃষ্টিতে ‘ডাবল প্রতারণা’ নির্ভর এমন রাজনৈতিক ব্যানারেও একাধিক দেশে প্রধানমন্ত্রীর গণসংবর্ধনা সরকারী খরচে আয়োজন করার নজির রয়েছে।

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা যেহেতু কোন দলের প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি যেহেতু দেশের প্রধানমন্ত্রী তাই বিদেশে রাষ্ট্রীয় খরচে আয়োজিত গণসংবর্ধনা কেন দূতাবাস বা হাইকমিশনের ব্যানারে অথবা তাদের তদারকিতে গঠিত কোন বিশেষ ‘নাগরিক কমিটি’র ব্যানারে আয়োজন করা হবে না, এই প্রশ্নের জবাব জানতে চান আজ দেশে দেশে সাধারন প্রবাসীরা, যারা বিদেশের মাটিতে অবৈধ দেশী রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত না থেকেও মনেপ্রাণে ভালোবাসেন বাংলাদেশকে।

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন