সারাদেশে অব্যাহত লোডশেডিং, মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ আসে

নিজস্ব প্রতিনিধি: বিদ্যুতের সেবার মান না বাড়লে বিল পরিশোধ করা হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন শরীয়তপুর সদর উপজেলার চন্দ্র্রপুর ইউনিয়নবাসী। গত শুক্রবার চন্দ্রপুর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে সমাবেশ করে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। চন্দ্র্রপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন। সমাবেশে চন্দ্রপুর ইউপি চেয়ারম্যান ওমর ফারুক বলেন, ২৪ ঘণ্টার এক ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না।

শুধু চন্দ্রপুর নয়, দেশের অনেক গ্রাম ও মফস্বল শহরের পরিস্থিতি একই রকম। দিন-রাত মিলিয়ে তিন-চার ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ মিলছে না। জ্যৈষ্ঠের গরমে মানুষের দুর্ভোগ অসহ্য হয়ে উঠেছে। কয়েকটি স্থানে বিক্ষুব্ধ গ্রাহকরা স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসগুলোতে হামলা করেছে।

পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) তথ্যমতে, রাজশাহী, রংপুর, যশোর, বরিশাল ও খুলনা অঞ্চলে পরিস্থিতি বেশি খারাপ। এসব অঞ্চলের ৪১টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎও পাচ্ছে না। আরইবির পক্ষ থেকে গত রোববার বিদ্যুৎ সচিবকে চিঠি দিয়ে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ না বাড়লে পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়েছে বলে জানা যায়।

আরইবির একজন পরিচালক জানিয়েছেন, তারা দিনে কমপক্ষে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং করতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি জানান, শনিবার সারাদেশে আরইবির চাহিদা ছিল ৪ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট। আর সরবরাহ করা হয়েছে ৩ হাজার ৮৫০ মেগাওয়াট।

কারণ :লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্রে জানা গেছে, মে মাসের শুরুতে কালবৈশাখীতে ভৈরবে বিদ্যুতের টাওয়ার ভেঙে পড়ায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে। অন্যদিকে রমজানে বিদ্যুৎ সরবরাহ উন্নত করার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বড় কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে মেরামতের কাজ চলছে। বিশেষ করে ঘোড়াশাল, বিবিয়ানা, মেঘনাঘাট, আশুগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জের ২০০ থেকে ৩০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়েকটি কেন্দ্র বন্ধ থাকায় উৎপাদন কমে গেছে। এ ছাড়া প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ায় চাহিদা, সরবরাহ ও উৎপাদনের মধ্যে ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয়েছে।

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুম আল বেরুনী সমকালকে বলেন, তারা ঠিকমতো বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না। বিদ্যুৎ সরবরাহ ঘাটতির কারণে তারা গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সি ঠিক রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন।

বিতরণ ব্যবস্থা :গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের একটি বড় কারণ দুর্বল বিতরণ ব্যবস্থা। একটু বৃষ্টিতেই গ্রামের বিদ্যুৎ চলে যায়। রাশেদুল হাসান জীবন নামে জামালপুরের এক গ্রাহক বলেন, এক ঘণ্টা বৃষ্টি হলে দু’দিন বিদ্যুৎ থাকে না। আগে আকাশে মেঘ ডাকলে মানুষ ঝড়ের ভয় করত, এখন চিন্তা করে এই বুঝি বিদ্যুৎ গেল। ঝড়-বৃষ্টি ছাড়া অন্য

সময়েও দুর্ভোগ হচ্ছে, কারণ গ্রামের অধিকাংশ বিতরণ লাইন জরাজীর্ণ। সূত্রমতে, বিতরণ লাইনের এক-তৃতীয়াংশই ওভারলোডেড। সক্ষমতার চেয়ে বেশি সংযোগ প্রদান ও পুরনো লাইনের কারণে বিতরণ ব্যবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

সম্প্রতি বুয়েটের অধ্যাপক ম. তামিম বলেছেন, সরকার বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা একটা পর্যায় পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এখন উচিত সঞ্চালন এবং বিতরণ ব্যবস্থার দিকে নজর দেওয়া। সেখানে যথেষ্ট ঘাটতি রয়ে গেছে।

নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা :বিদ্যুৎ দিতে না পারায় জনরোষের মুখে পড়ছে স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসগুলো। গত শনিবার মাদারীপুরের শিবচর, মেহেরপুর ও ফরিদপুরের পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত রোববার মাদারীপুরের পিডিবি কার্যালয়ের নিরাপত্তা চেয়ে স্থানীয় পুলিশ সুপারের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে বিদ্যুৎ সচিব আহমেদ কায়কাউস সমকালকে বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন যাতে বাড়ে সে জন্য পেট্রোবাংলাকে অতিরিক্ত গ্যাস দিতে বলা হয়েছে। বন্ধ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো দু-একদিনের মধ্যে উৎপাদনে আসবে। রমজানের আগে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তবে সহসা পরিস্থিতির উন্নতির বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করে বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেছেন, আশুগঞ্জ-সিরাজগঞ্জ সঞ্চালন লাইনের ভৈরব অংশের ভেঙে পড়া টাওয়ারটি মেরামতে তিন থেকে চার মাস সময় লাগবে। ওই লাইন দিয়ে প্রায় ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে সরবরাহ করা হতো। এখন ঘোড়াশাল-ঈশ্বরদী লাইন দিয়ে ওই অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু থাকলেও পুরো লোডে বিদ্যুৎ দেওয়া যাচ্ছে না। লোড বাড়ালে লাইন ট্রিপ করার আশঙ্কা থাকে।

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন