“হুন খাইছে গুইল্লা মাছে, মুখের দিকে তাজা আছে”: ব্যারিস্টার আবু সায়েম

সময় বাংলা, লন্ডন: নোয়াখালী অঞ্চলের মানুষেরা স্বকীয়তায় অনন্য। তাদের চালচলন, ভেশভুষা, রঙ-ঢং, খানাপিনা, লৌকিকতা সবকিছুই বাংলাদেশের বাকিসব অঞ্চল থেকে অনেকখানি ভিন্ন। তারা পরিশ্রমী, বন্ধুবৎসল ও পরোপকারী; আর অতিথিপরায়নতায় নোয়াখালীর খ্যাতি প্রায় কিংবদন্তীতুল্য। জেলা শহর থেকে পনের মাইল দক্ষিনে সুবর্ণচরের গেঁয়ো পথে আনমনে হাঁটতে থাকা কোন পথিক যদি অপরিচিত কারো বাড়িতে ঢুকে পিপাসা নিবারণের আর্জি জানায়, তাহলে গৃহস্থের পক্ষ থেকে নিদেনপক্ষে সরসমেত এক গ্লাস ডাবের পানি ও তেলে ভাজা এক টুকরো নারকোলের পিঠা মিলবেই। তবে উপকূলের বাসিন্দারা প্রকৃতির বিরুদ্ধে নিরন্তর যুদ্ধ করে বেঁচে থাকে বলে তারা হয় কিছুটা একগুঁয়ে স্বভাবের। নোয়াখালীর মানুষদেরও তাই জেদ বেশী, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা হয় নীতির প্রশ্নে।

তা যা-ই হোক, নোয়াখালীর সবচেয়ে বড় সম্পদ কিন্তু তাদের ভাষা। কেবল বৃহত্তর নোয়াখালীতেই নয়, প্রতিবেশী অনেক অঞ্চলের অধিবাসীরাও একই ভাষায় কথা বলে। তাদের ভাষা-কৃষ্টি-সংস্কৃতির পুরোটা জুড়েই নোয়াখালী। এর মধ্যে রয়েছে চাঁদপুর ও কুমিল্লার বড় একটি অংশ, ভোলার দক্ষিনভাগ এবং চট্টগ্রামের মিরসরাই ও সন্দ্বীপ। বাচন ও উচ্চারণে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী এ ভাষার রয়েছে অসংখ্য মৌলিক শব্দ। ভাবপ্রকাশে তাই নোয়াখালীর মানুষ তাদের নিজস্ব শব্দকোষের ওপর স্বচ্ছন্দে নির্ভর করতে পারে। ভাষার সমৃদ্ধতার কারণে নোয়াখালীর আঞ্চলিক গানও সর্বজনসমাদৃত। এ ভাষার নান্দনিক আর একটি দিক হচ্ছে বিচিত্রসব শ্লোক-ধাঁধাঁর সমাহার। নিত্যদিনের বিশেষ অভিব্যক্তি প্রকাশের জন্য প্রচুরসংখ্যক শ্লোক রয়েছে নোয়াখালীয় অভিধানে। মনে পড়ে, ছোটবেলায় মা শ্লোক শুনিয়ে শুনিয়ে আমাদের শাসন করতো। এখনো কানে বাজে, “চাচী, জেডি যতই ভালা মার মত নয়/ চিড়া মুড়ি যতই খাওন ভাতের মত নয়।” অর্থাৎ “মায়ের মতো আপন আর কেউ হতে পারে না। অন্যরা যতই মায়া দেখাক কখনোই মায়ের সমতুল্য নয়।”

নোয়াখালী সম্পর্কে এতোসব ভালো ভালো কথা বলছি, নোয়াখালীর ভাষা নিয়ে প্রশংসার ফুলঝুরি ফুটাচ্ছি, তার কারণ কিন্তু এই নয় যে, আমি নোয়াখালীর সন্তান কিংবা আমার জন্মস্থান নোয়াখালী। আজকের এ বিশেষ আলোচনার অন্তর্গত উৎস মূলত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। কেনো এবং কীভাবে – সে আলোচনাই এ লেখার উপজীব্য।

১৭ই ডিসেম্বর ঢাকায় বিজয় দিবসের এক আলোচনা সভায় শেখ হাসিনা তার স্বভাবসুলভ কদর্যতায় রাষ্ট্রপিতা শহীদ জিয়াউর রহমান, বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে অনভিপ্রেত বিষদগার করেন। বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্টকে ইঙ্গিত করে শেখ হাসিনা বলেন, “একজন ছিল সাধারণ এক মেজর। জাতির পিতা তাকে পদোন্নতি দিয়ে মেজর জেনারেল বানালেন। সেই বেঈমান, মুনাফেক জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুকেই হত্যার সঙ্গে জড়িয়ে পড়লো।” (সূত্র- মানবজমিন, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭)

অতিকথনজনিত সমস্যায় যারা ভোগেন, তারা প্রায়শই বেফাঁস কথা বলে ফেলেন – কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে কখনো মনের অগোচরে। শেখ হাসিনার সমস্যাও বহুলাংশে তা-ই। ২০১২ সালের ৩০শে মে লন্ডনে এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান শেখ হাসিনাকে যৌক্তিক কারণেই বাচাল বলে অভিহিত করেছিলেন। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে হাসিনা যে কতটা নিচে নামতে পারেন, তা এখন আর কারো অজানা নয়। ২০১৫ সালের ৪ঠা অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে গণভবনে এক সাংবাদিক সম্মেলনে শেখ হাসিনা বিএনপি চেয়ারপার্সন ও বাংলাদেশের তিন তিন বারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে অরুচিকর যে মন্তব্য করেছিলেন, তা এযাবৎ আমার দেখা বিশ্বের কোন রাজনৈতিক নেতার নিকৃষ্টতম ছেনালি যা লেখনীতে অপ্রকাশযোগ্য। তবে তার অন্য একটি বক্তব্য আমি এখানে রেফারেন্স হিসেবে উল্লেখ করবো, জনস্বার্থে। আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর পর তার শোকাচ্ছন্ন মমতাময়ী মা বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে ২০১৫ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “নিজের পুত্রশোক তাকে টলাতে পারলোনা। এতোই কঠিন মা যে নিজের সন্তানের লাশটা নিজের বাসায় নিলোনা! আর শোক জানানোর ছবি আমরা কী দেখলাম? তিনি নতুন শাড়ি পরে একেবারে হিরোইনের মতো বসে আছেন চেয়ারে।” এমন অশালীন ভাষায় কোন নেতা বা নেত্রী তার ক্লেদ ঝাড়তে পারেন, শহীদ জিয়া ১৯৮১ সালের ১৭ই মে শেখ হাসিনাকে বাংলাদশে ফিরে আসার সুযোগ না দিলে বিশ্ববাসী হয়তো তা কখনোই জানতে পারতো না।

প্রখ্যাত সাংবাদিক শফিক রেহমান শেখ হাসিনার এ বাচালতাকে রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন আওয়ামী লীগের ১৯৯৬-২০০১ শাসনামলে। হাসিনা তখন আজকের মতো এতটা ক্ষমতাধর ছিলেন না, তাই তাকে নিয়ে সেকালে কিছু কিছু সমালোচনা করা যেতো। আমার মনে পড়ে, শফিক রেহমান তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চিকিৎসা গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন, এতে লজ্জার কিছু নেই। প্রস্তাবিত চিকিৎসাটির ওপর একটুখানি আলোকপাত করার লোভ সংবরণ করতে পারছি না। সে পদ্ধতি অনুযায়ী, একটি সুনির্দিষ্ট সময়ের জন্য বাচালদের ঠোঁট সেলাই করে রাখতে হয় যখন তারা জিহ্বার পরিবর্তে দেহের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দ্বারা ব্যবহার মনের ভাব আদানপ্রদান করে। আমার জানা নেই, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মূল্যবান সে পরামর্শ কানে তুলেছিলেন কিনা, তবে সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি – “Better Late Than Never”। দেশ, দল ও জনগণের কল্যাণে দেরিতে হলেও শেখ হাসিনা তা পরখ করে দেখতে পারেন।

সে যা-ই হোক, আমার উপলব্ধির জায়গাটা ভিন্ন। একজন মানুষ ক্রমাগত এতো বানোয়াট, অসংলগ্ন ও নোংরা উক্তি করে কীভাবে? বহুবছর যাবত রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে অধিষ্ঠিত থেকেও বিকারগ্রস্তের মতো এমন আচরণ কী করে সম্ভব? আরও অবাক লাগে যখন ভাবি, টানা আট বছরের অপশাসনে যারা বাংলাদেশকে তছনছ করে ফেলেছে, যাদের ক্ষমতায় থাকার ন্যুনতম বৈধতা নেই, যোগ্যতাও নেই, যারা প্রতিবেশীর কোমরের জোরে গদিতে বসে আছে, তাদের মুখ থেকে এতবড় বুলি বের হয় কোন সাহসে? শেখ হাসিনারতো ভুলে যাওয়ার কথা নয় যে, তার কাঁধে ঝুলে আছে ৫৭ জন দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তা হত্যাসহ শত-হাজার কোটি টাকা লুটপাট এবং সহস্র পৈশাচিক গুম-খুনের দায়ভার।

তবে সব অপরাধ গৌণ করে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব প্রতিবেশীর হাতে তুলে দিয়ে তিনি যে লেন্দুপ দর্জির মর্যাদা বরণ করেছেন সেকথাও শেখ হাসিনাকে স্মরন করিয়ে দিতে চাই। যে বিজয় দিবসের আলোচনা করতে গিয়ে তিনি জিয়া পরিবার ও বিএনপির দিকে বিষাক্ত তীর ছুঁড়েছেন, ৪৭তম সে বিজয় দিবসেই ভারত আমাদের গর্বের মুক্তিযুদ্ধকে ‘ভারত-পাকিস্তান’ যুদ্ধ বলে আখ্যায়িত করেছে। খোদ রাজধানী ঢাকার জাতীয় জাদুঘরে বসেই ভারতীয়রা ধৃষ্টতা দেখিয়েছে আমাদের মহান অর্জনটিতে কালিমা লেপে দিতে। আর সেখানে উপস্থিত অবৈধ সরকারের ‘মুক্তিযুদ্ধ’ মন্ত্রী তাতে ‘একটু কষ্ট’ পেয়েছে। সে বিনয়ের সাথে বলেছে, “যৌথবাহিনী পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে।” সাহস করে এটুকুও বলতে পারেনি, ৭১’র মুক্তিসংগ্রাম ছিল ‘বাংলাদেশ-পাকিস্তান’ যুদ্ধ, ‘পাক-ভারত’ নয়। বাংলাদেশ ও ভারতের দূতাবাসের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানটিতে ভারতীয় মেজর জেনারেল এইচ এস ক্লে’র ‘১২ দিনে ঢাকা বিজয়’ বইয়ের উন্মোচন করা হয় যার পরিচিতিতেও লেখা আছে ‘ভারত-পাক’ যুদ্ধ। ১৬ই ডিসেম্বর কোলকাতার বিজয় উৎসবেও একই ঘটনা ঘটে। আবার বঙ্গভবনের চারধারের ঘরগুলোর চালে রঙ মাখানো হয় ভারতীয় পতাকার আদলে। এসব বিষয়ে হাসিনার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। নিজেদের ইজ্জত-সম্মানে গোমূত্র ঢেলে দিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নেমেছেন জিয়াউর রহমানের গোষ্ঠী উদ্ধার করতে। এমন বেহায়াপনাও জগতে কেউ করতে পারে!

কারণে অকারণে রাগগোস্বা সবার মনেই জমাট বাঁধে, কিন্তু শালীনতা-ভদ্রতা বলেতো একটা ব্যাপার আছে। কথা প্রসঙ্গে কথা আসে। ‘The Troy’ ছবির বিখ্যাত একটি দৃশ্যের স্মৃতি কল্পনায় ভাসছে। মহাবীর হেক্টরকে দ্বৈরথে হত্যা করে গ্রীক মহাবীর অ্যাকিলিস তার মৃতদেহ নিয়ে যায় সমুদ্রতীরবর্তী গ্রীক শিবিরে। এদিকে ট্রয়ের রাজা প্রিয়াম রাতের অন্ধকারে গোপনে অ্যাকিলিসের ডেরায় উপস্থিত হয় পুত্রের লাশ ফিরে পাওয়ার বাসনা নিয়ে। কথাবার্তার এক পর্যায়ে অ্যাকিলিস হেক্টরের মৃতদেহ ফেরত দিতে রাজি হলেও প্রিয়ামের উদ্দেশ্যে বলতে থাকে, “I’ll let you take him. It doesn’t change anything. You’re still my enemy in the morning.” প্রত্যুত্তরে ছিল রাজা প্রিয়ামের কালোত্তীর্ণ সেই উক্তি, “You’re still my enemy tonight. But even the enemies can show respect.” প্রতিপক্ষকে সম্মান দেখিয়েও যে রাজনীতি করা যায়, শেখ হাসিনা এমন শিক্ষা যত দ্রুত লাভ করবে ততোই দেশ-জাতির জন্য মঙ্গল।

আওয়ামী লীগ নেত্রী যে ব্যাকরণে কথা বলেন, যে ভঙ্গিতে জাতীয় নেতানেত্রীদের নিয়ে রঙ্গতামাশা করেন তার সমুচিত জবাব দেওয়ার উপযুক্ত ভাষা খুঁজে পাওয়াও দুষ্কর। বিজয় দিবসের আলোচনায় তিনি মহান স্বাধীনতার ঘোষককে বেঈমান-মুনাফেক বলে গালি দিয়েছেন! এ গালির বিপরীতে পাল্টা গালি দিতে পারলে হয়তো বুকের আসল জ্বালা মিটতো। কিন্তু জনগণের রুচিবোধ ততখানি নিচে নয়, যতখানি আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর। প্রমিত বাংলা অভিধান ঘেঁটে যুতসই কিছু মেলেনি, তবে নিজ জেলা নোয়াখালীর সমৃদ্ধ শ্লোক-বচনে খানিকটা হলেও জবাব খুঁজে পেয়েছি। “হুন খাইছে গুইল্লা মাছে, মুখের দিকে তাজা আছে।” অর্থাৎ ‘ট্যাংরা মাছ পেছনের দিক খেয়ে ফেলেছে, তারপরও মুখ থামছে না।’ শেখ হাসিনা ভারতের কাছে সবকিছুই বিসর্জন দিয়েছেন, দেশের কষ্টার্জিত স্বাধীনতাও, তারপরও তার চোয়ালের জোর কমছে না।

বেহায়াপনার একটা শেষ থাকে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও তার দলের হায়া-শরম লোপ পেয়েছে। বহুবার সুধী সমাজ শেখ হসিনাকে সতর্ক ও অনুরোধ করেছে, তিনি যেন তার জিহ্বা সংযত করেন। কিন্তু তাতে তিনি কর্ণপাত করেননি।

নোয়াখালীর শ্লোক দিয়েই শেষ করি, “বেহাইয়ারে মারি হিছা, বেহাইয়া কয় হুদা মিছা।”

লেখক ব্যারিস্টার আবু সায়েম
বিএনপি সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা
আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ
লন্ডন ১৮/১২/২০১৭

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন

এ বিভাগের আরো খবর