”হে বৈশাখ তোমাকে চিনতে পারি যেন ঠিক তোমারি মতন” ”স্বাগতম ১৪২৪ বঙ্গাব্দ”

এড. মোঃ সলীমুল্লাহ খান: বাংলা সনের চৈত্র মাস হলো বৎসরের শেষ মাস, তার পরদিনই নতুন বৎসরের আগমন, যা পহেলা বৈশাখ নামেই আমাদের সবার নিকট পরিচিত। এই বাংলা সনকে আকবরী সন হিসাবেও আখ্যায়িত করতে দেখেছি, এটার যুক্তিও প্রকট। মোগল সাম্রাজ্যের উজ্জলতম নক্ষত্রের নাম সম্রাট জালালুদ্দিন মোহাম্মদ আকবর, ইতিহাসে যিনি পরিচিতি লাভ করেছেন ”আকবর দ্যা গ্রেট” হিসাবে। উনার বাবা হুমায়ুন ছিলেন এক ধরনের ব্যর্থ সম্রাট যুদ্ধ, আসন দখল বেদখলের মধ্যে এক ধরনের যাযাবর জীবনের পথিক ছিলেন হুমায়ুন। তবে তার সবচাইতে বিশ্বস্থ সেনাপতি ছিলেন বৈরাম খাঁ। পলাতক জীবনে উনার ঔরষে জন্ম লাভ করেছিলেন যে শিশুটি তার নামই ছিলো জালালুদ্দিন মোহাম্মদ আর আকবর হলো উনার উপাধী।

বাদশাহ হুমায়ুন শিশু আকবরকে তার বোনের নিকট নিরাপদ লালন পালনের জন্য পাঠিয়ে দেন। তাঁর বয়স যখন চার বৎসর সে সময়ে বৈরাম খাঁ এর যুদ্ধে সাফল্য আসে, আর অজ্ঞাতবাসেই হুমায়ুনের মৃর্ত্যু ঘটে। তখন বৈরাম খাঁ কৌশল করলেন সবার মাঝে ঐক্য ধরে রাখতে মাত্র চার বৎসর বয়সের জালালুদ্দিনকে সিংহাসনে বসিয়ে রাজ্যাভিষেক করে সম্রাট ঘোষণা করে দিলেন। তাকে কঠোর যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শি করে তুললেন কিন্তু পড়ালেখা বা সাধারণ অন্য জ্ঞান বা ধর্মীয় কোন জ্ঞান লাভ করতে পারেননি। উনার এইসব বিষয়ে যেমন সিক্রির ইমাম, বৈরাম খাঁ, উনার ফুফু যিনি উনাকে লালন পালন করেছিলেন, তাদের পরামর্শ নিয়ে তিনি রাজ্য পরিচালনা করতেন।

এরপর তিনি মাত্র ১৪ বৎসর বয়সেই পূর্ণাঙ্গ রাজ্যভার গ্রহণ করেন। তার আপন বোনের স্বামী বিদ্রোহ করেছিলেন মল্লযুদ্ধে বোনের স্বামী পরাজিত হন। নিয়ম ছিলো পরাজিত হলে তাকে কতল করা, তখন আকবর তার বোনের স্বামীকে ক্ষমা করে দিয়ে দূরের একটা এলাকার সুবেদার নিয়োগ দেন। তাতে করে বৈরাম খাঁর সঙ্গে মতবিরোধ ঘটে তখন আকবর বৈরাম খাঁ কে অবসরে পাঠিয়ে দিয়ে নিজেই সেনাপতির আসন অলংকৃত করেন। এরই এক পর্যায়ে তিনি দেখলেন হিন্দু বা অন্য ধর্মের লোকদের আলাদা কর দিতে হয়। জিজিয়া কর তাহা তিনি মওকুফ করে দিলে হিন্দু নেতারা আস্তে আস্তে আকবরের চারপাশে জমায়েত হন।

তাহার যেহেতু লেখাপড়া বা ধর্মীয় জ্ঞান ছিলোনা, তাই তার যা ভালো লাগতো তিনি তাহাই রাজ্যে পালনের নির্দেশ দিতেন, তিনি সকল ধর্মের ধর্মগুরুদের ডেকে সকল ধর্মের ভালো ভালো সার বস্তুকে নিয়ে নতুন এক ধর্মের ঘোষণা দিলেন ”দ্বীনে ইলাহী” তখন সিক্রির ইমাম সহ ইসলামের আলেমগণ তা বন্ধ করতে অনুরোধ জানান।  তখন আকবর সিক্রির ইমামকে অপসারণ করেন, এরপর তিনি আরবী হিজরী সনের সাথে মিলিয়ে হিন্দুদের প্রাচীন পূঞ্জিকার সাথে মিলিয়ে এই বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন বা আকবরী সন একটি কমিটি করে তাদের মতামত নিয়ে এই নতুন সালের নাম বা গননা শুরু করার আদেশ দেন। তার বড় প্রমান হলো আকবর এর সময় থেকে শুধু এ সালের গননা শুরু করলে ১৪২৪ সাল হতোনা অর্ধেক হতো, ইহা হিজরী সনেরই একটা স্থানীয় ভার্সণ, বা আকবর বাদশার ভার্সণ বলা যায়।

কিন্তু এই সন কোন নির্ধিষ্ট ধর্মের নয়, বরং সকল ধর্মের লোকদের জন্য এটা একটি সামাজিক প্রথা হিসাবে পালন করাই উচিত কাজ। বাংলাদেশের মানুষের জন্য এটা একটা অসাম্প্রদায়িক উৎসব হিসাবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু এরশাদ সরকারের আমলে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ সহ আরো প্রতিথযশা লোকদের সমন্বয়ে উক্ত সনের একটি ডিফেক্ট ছিলো যার কারণে এর তারিখ নির্ধিষ্ট থাকতোনা। এটা যদিও চন্দ্র মাসের অনুকরণে করা হয়েছে কিন্তু এটার কার্যক্রম চালানো হয় ভিন্নভাবে।

যেমন উদাহরণ চন্দ্রমাস আসে সন্ধ্যার সময় থেকে চাঁদ দেখার উপর নির্ভর করে, আর পহেলা বৈশাখ পালন বা বরণ অনুষ্ঠান করা হয় সকালে সূর্য উদয়ের সাথে সাথে, তাই এরশাদের আমলে এটার একটা সমাধান করা হয় বাংলা মাসের মধ্যে যে মাসটি ৩২ দিনের যা অবৈজ্ঞানিক ছিলো। তাই ঐ মাসটি থেকে একদিন বাদ দিয়ে সঠিক করা হয় এরপর থেকে ইংরেজী বৎসর বা সূর্য বৎসরের মতো প্রতি বৎসর ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ স্থিরিকৃত হয়। এবং সকল শিক্ষিত জ্ঞানী মানুষ এটা মেনে নেন।

সবাই মিলে এই দিনে এক মহা উৎসবের আয়োজন হয়, নতুন জামা, মেলা, নতুন নতুন গিফট তাছাড়াও প্রতি বৎসর যোগ হচ্ছে নতুন আনন্দের নতুন ইভেন্ট।

যাক এবার বলতে চাই বাংলাদেশ সরকারের আদেশ এবং সরকারী ছুটীর দিন সবাই মানলেও হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি অংশ ভারতের হিন্দুদের পূঞ্জিকার অনুসারী হয়ে দেশের মানুষের সাথে তাহা পালন না করে একদিন পর পালন করে, যা এক ধরনের রাষ্ট্রদ্রোহীতার কর্ম, এখানে বাংলা সনের সাথে কোন ধর্মের যোগ থাকতে পারেনা তাহাই আমি উপরে নাতিদীর্ঘ ইতিহাস আলোচনা করেছি। আর যদি থাকেও তাহা মুসলিমদের সাথে থাকতে পারে, হিন্দুদের এখানে বক্তব্যের কোন সুযোগই থাকতে পারেনা।

তাই ১৪২৪ সালের প্রাক্কালে বলতে চাই,
”এসো হে বৈশাখ এসো হে ….
”ঐ নতুনের কেতন উড়ে কাল বৈশাখীর ঝড়…
”তোরা সব জয়ধ্বনি কর..
”আম শাখে মুকুলে ভারী,
নিত্য নতুন সাঁজে নর নারী,
তখনি মনে জানান দেয় বৈশাখ তুমি এসে গেছ আমাদের মাঝে,
তাই তোমার নিকট প্রার্থনা হে বৈশাখ,
তোমাকে চিনিতে পারি যেনো ঠিক তোমারী মতো”

আমার সকল শুভাকাংখী বন্ধু বান্ধবী, নিউজ চ্যাণেলের সকল কর্মকর্তাদের সহ তাবত দুনিয়ার সকল বাংলাদেশী ভাই বোনদের প্রতি আমি জানাই অগ্রীম প্রাণঢালা শুভেচ্ছা, নতুন বছর যেন সকলের জন্য শুভ বার্তা বয়ে আনে, আমার প্রাণের বাংলাদেশ যেনো শৃংখলমুক্ত হয়ে নিরাপদ আবাসস্থল হিসাবে পৃথিবীর বুকে মাথা উচু করে দাড়াতে পারে।

সময়বাংলা/এডি/জ

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন