৫ জানুয়ারির কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগ ‘একা’, শরিক দলগুলো দিনটিকে উপেক্ষা করেছে

সময় বাংলা, ঢাকা: দশম সংসদ নির্বাচনের চার বছর পূর্তিতে ক্ষমতাসীন জোটের মধ্যে একমাত্র আওয়ামী লীগ কর্মসূচি পালন করেছে। তাদের শরিক দলগুলো দিনটিকে উপেক্ষা করেছে। এমনকি আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতেও যোগ দেননি শরিক দলের নেতারা।

গত চার বছরে এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে প্রথমবারের মতো ঘটেছে। কেন এটি ঘটেছে তার কারণ জানার চেষ্টা করছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। যদিও গণমাধ্যমের কাছ এই উদ্বেগের বিষয়টি জানাতে চান না তারা।

দশম সংসদ নির্বাচনে ভোটের দিনটি আওয়ামী লীগের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতাসীনরা মনে করে. সেদিন ভোট করতে না পারলে দেশে আবার অসাংবিধানিক সরকার আসতো। আর এই ভোট আওয়ামী লীগ এককভাবে করেনি। জোটের শরিকরাও সঙ্গে ছিল তখন।

এবার ভোটের চতুর্থ বর্ষ পূর্তিতে আওয়ামী লীগ রাজধানী এবং জেলা শহরগুলোতে সমাবেশ এবং মিছিল করেছে। ঢাকায় বনানী এবং বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে সমাবেশ ছাড়ায় বিজয় মিছিল করেছে দলটি। কিন্তু এসব সমাবেশে শরিক দলগুলোর নেতারা ছিলেন অনুপস্থিত।

আবার ৫ জানুয়ারিকে ঘিরে কর্মসূচি নির্ধারণে এবার আওয়ামী লীগ শরিক দলগুলোর সঙ্গে কোনো বৈঠক করেনি। একটি শরিক দলের নেতা জানান, আজকের কর্মসূচিতে তাদের আমন্ত্রণও জানায়নি আওয়ামী লীগ। আর কেউ যেতে না বললে যাওয়া শোভনীয় হয় না।

ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন কর্মসূচিতে শরিক দলগুলোর উপস্থিতি ছিল, এমন তথ্য পাওয়া যায়নি সেভাবে। আবার শরিক দলগুলো আলাদা কর্মসূচিও দেয়নি। এ নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে কথাও হচ্ছে।

সম্প্রতি শরিক দলগুলোর সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্কে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে নেতাদের বিভিন্ন উক্তিতে। বৃহস্পতিবার ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন আওয়ামী লীগকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, আগামী নির্বাচনে জোটের কোনো দল একলা চল নীতি নিলে সেটি হবে আত্মঘাতী।

আবার মাস কয়েক আগে ১৪ দলের অন্যতম শরিক জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু আওয়ামী লীগের নাম উল্লেখ করেই বলেছেন, শরিকদের সহায়তা ছাড়া একশ বছরেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে পারবে না। তাদেরকে ‘ভ্যা ভ্যা করে’ রাস্তায় ঘুরতে হবে।

আবার সরকারের চার বছর পূর্ণ হওয়ার আগে আগে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিসভায় তিন জন নতুন মুখ যোগ হয়েছে। একজনের হয়েছে পদোন্নতি। এদের মধ্যে তিন জন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আর টেকনোক্র্যাট কোটায় যিনি নতুন মন্ত্রী হয়েছেন তিনিও আওয়ামী ঘরনার লোক হিসেবে পরিচিত।

আবার পর পরদিন নতুন মন্ত্রীদের দপ্তর বণ্টনের পাশাপাশি চার জন মন্ত্রীর দপ্তর পাল্টে দেয়া হয়। এদের দুই জনই শরিক দলের। একজন হলেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, অপরজন জাতীয় পার্টি-জেপির সভাপতি আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। আবার আরেক শরিক জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর মন্ত্রণালয়ে একজন প্রতিমন্ত্রী দিয়েছে সরকার।

মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ ও রদবদল নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। শরিকরা এতে নাখোশ বলেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন এসেছে।

এর পর আবার ৫ জানুয়ারি শরিকদেরকে ছাড়া আওয়ামী লীগের এককভাবে কর্মসূচি পালন। তবে কি জোটে কোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে? জানতে চাইলে ১৪ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘দলীয় কর্মসূচি নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। তাই সময়ের অভাবে আলাপ আলোচনা হয়নি। এজন্য জোটগতভাবে কোন কর্মসূচি ঘোষণা করা যায়নি।’

নাসিম এমন যুক্তিও দেখিয়েছেন যে, কোনো কর্মসূচি আওয়ামী লীগ পালন করলে ১৪ দলেরও পালন হয়ে যায়। এটিকে কেন্দ্র করে জোটের মধ্যে দূরুত্ব তৈরি হয়েছে এমন করে কিছু দেখার নেই।’

এক প্রশ্নের জবাবে ১৪ দলের সমন্বয়ক বলেন, ‘জাসদ (একাংশ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুসহ কিছু নেতা দেশের বাইরে থাকায় চলতি বছর ৫ জানুয়ারিকে ঘিরে কর্মসূচির বিষয়ে জোটের মধ্যে আলোচনার সুযোগ হয়নি।’

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমরা দলীয়ভাবে এ কর্মসূচি পালন করি। জোটের শরিকদের অনুপস্থিতিকে আমরা বড় করি দেখছি না। আমাদের জোট আছে থাকবে।’

সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দীলিপ বড়ুয়া বলেন, ‘আমি মনে করি আলাপ আলোচনা না হওয়ার কারণে জোটগতভাবে কর্মসূচি পালন হয়নি। এখানে ভিন্ন কিছু খোঁজার কারণ নেই।’

জাসদের (একাংশ) সভাপতি শরিফ নুরুল আম্বিয়া বলে, ‘আমি মনে করি, পূর্ব থেকে আলাপ আলোচনা না হওয়ায় জোটগতভাবে দিবসটি উপলক্ষে কোন কর্মসূচি পালন হয়নি। এখানে অন্যকোন কারণ আছে বলে আমি মনে করি না।’

ইনুর নেতৃত্বাধীন জাসদের সাধারণ সম্পাদক শিরিন আক্তার দাবি করেছেন, তাদের কর্মসূচি ছিল আজ। তিনি বলেন, ‘৫ জানুয়ারি আমরা প্রতি বছরই পালন করি। আজকেও অনেকগুলো কর্মসূচিতে আমার বক্তব্যে বলছি ৫ জানুয়ারি নির্বাচন সংবিধান রক্ষার নির্বাচন।’

তবে আওয়ামী লীগের কোনো কর্মসূচিতে যোগ না দেয়ার কথা স্বীকার করে শিরিন বলেন, ‘কিছু দুর্বলতা থাকায় যৌথভাবে কিছু হয়নি। ১৪ দলীয় জোট অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এখানে কিছু সিদ্ধান্ত হয়, আলাপ আলোচনা হয়। এগুলোকে কার্যকর করতে হয়। কিন্তু অনেক বিষয়ে আমরা পদক্ষেপ গ্রহণ করতে আমরা পারি না।’

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য আনিসুর রহমান মল্লিক এ জন্য এমপিওভুক্তির দাবিতে আন্দোলনকে কারণ হিসেবে দেখাতে চাইছেন। তিন বলেন, ‘এ মুহূর্তে এমপিওভুক্তির জন্য বেসরকারি শিক্ষকরা আন্দোলন করছে। তাই এ সময়ে গণতন্ত্রের বিজয় দিবস উপলক্ষে কোন কর্মসূচি পালন জনগণ শোভনীয় হবে না বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে।’

‘অন্যান্যবার আমরা কর্মসূচিটি পালন করেছি এবং দিনটিকে গণতন্ত্র রক্ষা দিবস হিসাবেই আমরা মনে করি। এবারই আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে কর্মসূচি পালন করেছে এবং আমাদের ডাকা হয়নি।’

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন