মন্ত্রী-সচিবের দফতর জড়িত : মন্ত্রণালয় ও বিএমইটিতে দালাল চক্রের কাছে জিম্মি বিদেশ গমনেচ্ছুরা

সময় বাংলা ডেস্ক :

clip_image002_112394বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ও বিএমইটি’র সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে কাজের সন্ধানে বিদেশ গমনেচ্ছুরা। আর এই সিন্ডিকেটের সাথে স্বয়ং মন্ত্রী-সচিবের দফতরও জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। মন্ত্রণালয়ে লিটন নামের এক দালাল সচিবের নাম ভাঙ্গিয়ে দীর্ঘ দিন থেকেই একটি সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দিচ্ছে বলেও জানা গেছে। সচিবের সঙ্গে এ বিষয়ে কেউ অভিযোগ করলেও তিনি ‘জানেন না’ বলে উত্তর দেন। অথচ এই চক্রটির সঙ্গে তার দহরম-মহরম সম্পর্কের কথা বেশ আলোচিত।

অন্যদিকে মন্ত্রীর দফতরকে কেন্দ্র করেও গড়ে উঠেছে আরেকটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। বিশেষ ক্ষমতাধর যৌথ এই দালাল চক্রের দৌরাত্ম দিন দিনই বেড়ে চলছে। ভুক্তভোগী হচ্ছে জনশক্তি রফতানিকারকরা। এর পুরো ধকল গিয়ে পড়ছে বিদেশ গমনেচ্ছু নিরীহ মানুষদের ওপর।

সূত্রমতে, নিজেদের মধ্যে আঁতাত করে প্রতিনিয়ত দালালরা আদায় করছে মোটা অংকের অর্থ। দীর্ঘ দিন থেকে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিয়ে মন্ত্রণালয় ও বিএমইটি’র এই দালাল সিন্ডিকেট বৈধ জনশক্তি রপ্তানিকারকদের প্রতিনিয়ত জিম্মি করে চলেছে। মন্ত্রী পরিবর্তনের কারণে কিছু পুরাতন দালাল চলে গেলে সেখানে যোগ হয় কিছু নতুন সদস্য। আর এভাবে মিলে মিশে চলে টাকা আদায়।

তবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব খন্দকার ইফতেখার হায়দারকে শীর্ষ নিউজ ডট কমের এই প্রতিবেদক প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, সুনির্দিষ্টভাবে কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা লিখিতভাবে জানাতে হবে। মন্ত্রণালয় বা বিএমইটিতে কোন দালাল চক্রের স্থান নেই। কেউ অবৈধভাবে একটি টাকাও লেনদেন করবেন না। অভিযোগ থাকলে আমাদেরকে জানাবেন, আমরা ব্যবস্থা নেব। কিন্তু, সচিবের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগসাজশসহ ব্যাপক দুর্নীতির যে অভিযোগ রয়েছে সে প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলে তিনি এড়িয়ে যান।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিএমইটি বা জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো’র দালাল চক্রের ‘ছাড়পত্র ইস্যু’ বাণিজ্যের কারণে বিদেশ গমনেচ্ছু কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। অথচ সরকারের ঘোষণা ছিল জনপ্রতি মাত্র ১৭ হাজার টাকার বিনিময়ে সউদী আরবে কর্মী প্রেরণ করা হবে। অথচ ছাড়পত্র ছাড় করতেই মন্ত্রণালয় বা বিএমইটিতে গুণতে হয় ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা। আর এই টাকা সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সীর মালিক আদায় করেন বিদেশ গমনেচ্ছু তার পার্টির (ক্লাইন্ট) কাছে থেকে। এভাবেই বেড়ে যায় জনপ্রতি অভিবাসন ব্যয়। হয়রানির শিকার হন কাজের সন্ধানে বিদেশে গমনেচ্ছু লাখো মানুষ।

মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, প্রভাবশালী এই চক্রটি বিদেশগামী কর্মীদের বহির্গমন ছাড়পত্রের অনুমোদনের চিঠি আটকিয়ে রেখে পাসপোর্ট প্রতি কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা করে ঘুষ হাতিয়ে নিচ্ছে। কোনো রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক এই ঘুষ বাণিজ্যের প্রতিবাদ করলে, তাদের লাইসেন্স বাতিল করে দেওয়াসহ বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সদস্য জানিয়েছে।

শুধু গত ডিসেম্বরেই এই চক্রটি বায়রার সদস্যভুক্ত বিভিন্ন রিক্রুটিং এসেন্সীর প্রায় এক হাজারের বেশি বিদেশ গমনেচ্ছুর ছাড়পত্র আটকিয়ে দিয়েছিলো তারা অর্থ দিতে রাজি না হওয়ায়। অর্থ না দিলে নানা রকমের অজুহাত তুলে ছাড়পত্র আটকিয়ে দেয়া হয়। আর চাহিদামতো অর্থ দিলে কোনো কিছুই খতিয়ে দেখা হয় না। সবকিছুই জায়েজ হয়ে যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বায়রা’র এক সদস্য শীর্ষ নিউজ ডটকমের এই প্রতিবেদককে জানান, দালাল চক্রের এই সিন্ডিকেট সৌদীগামী সিনানের একশ’ জন, গ্যালাক্সির সাতচল্লিশ জন, রেডিয়াসের ইরাকগামী একান্ন জন, স্মার্ট কেয়ারের একশত পঁয়তাল্লিশ জন, আইডিয়া বিজনেসের ত্রিশ জন, তিশা ইন্টারন্যাশনালের ইরাকগামী একশ’ পচিশ জন, ইউনাইটেড এক্সপোর্টের আটজন, প্যাসেজের একশ’জন, আল সামিটের ত্রিশ জন, এয়ার কানেকশনের পনের জন, বেঙ্গল টাইগারের ইরাকগামী একুশ জন, এভিয়েট ইন্টারন্যাশনালের তের জন, আমান এন্টারপ্রাইজের আটষট্টি জন, সাদমানের চারশত নয় জন, এসএম ইন্টারন্যাশনালের তেষট্টিজন, শরিফ অ্যান্ড সন্সের একশ’ জন, পারফেক্টের চল্লিশজন, জেনেটিক্সের ইরাকগামী দুই শত বাইশ জন, এয়ার ওয়েজের আটাশ জন, আল রাহাতের সাত জন, পুনম ইন্টারন্যাশনালের দুই শত পঁয়ত্রিশ জন, ইসমাইল রিক্রুটিং হাউজের আটাশ জন, কনকর্ডের উনিশ জন এবং নর্থ বেঙ্গলের ইরাকগামী নিরানব্বই জনের বর্হিগমন অনুমোদনের ফাইল আটকিয়ে রাখা হয়েছিলো। সংশ্লিষ্ট জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সঙ্গে আর্থিক বোঝাপড়ার পর ফাইল ছাড়া হয়েছে।

বায়রার একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, এসব দালাল চক্র কোটি কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য করলেও ভয়ে কেউই মুখ খুলতে সাহস করছে না। মন্ত্রণালয়ের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে মন্ত্রীর দফতরের সিন্ডিকেটের মূল হোতা হিসেবে কাজ করছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের খুবই প্রভাবশালী একজনের ভাগিনা দাবিদার সারোয়ার হোসেন। এর সঙ্গে রয়েছে নীরু, আদনানসহ আরো কয়েক জন।

এ বিষয়ে বায়রার সভাপতি মোহাম্মদ আবুল বাশার শীর্ষ নিউজ ডট কমের এ প্রতিবেদককে জানান, অনেকেই ছাড়পত্র নিতে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তবে আমাদের সদস্যদের মধ্য থেকেও কেউ লিখিতভাবে বায়রার কাছে অভিযোগ করছে না। মন্ত্রীর ছেলের নামে কেউ কেউ আর্থিক এই অবৈধ সুবিধা নিচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মন্ত্রী সাহেব নতুন এসেছেন। তার পরিবারের কেউ জড়িত কিনা এ বিষয়ে এখনো কিছু আমি জানি না।

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন