‘প্রধান বিচারপতির বক্তব্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল থাকে’

সময় বাংলা ডেস্ক :

sk sinhaপ্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার দেয়া বক্তব্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল থাকে। এমন মন্তব্য করেছেন দেশের বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ও রাজনীতিবিদরা ।

অবসরে যাওয়া বিচারপতিদের রায় লেখা প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহার দেয়া বক্তব্য নিয়ে  রাজনৈতিক ও বিচারাঙ্গনে আলোচনার ঝড় উঠেছে।

যেসব বিচারপতি অবসর গ্রহণ করে রায় লিখেছেন বা লিখছেন, তাদের রায়ের আইনগত বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সবচেয়ে আলোচিত ত্রয়োদশ সংশোধনীবিষয়ক রায়ও লেখা হয়েছে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক অবসরে যাওয়ার পর।

২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি বাংলাদেশের ২১তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন বর্তমান প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। গত ১৭ জানুয়ারি তার মেয়াদের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে একটি লিখিত বিবৃতি দেন তিনি। ১৯ জানুয়ারি রাতে বিবৃতিটি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে আপলোড করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘কোনো কোনো বিচারপতি রায় লিখতে অস্বাভাবিক বিলম্ব করেন। আবার কেউ কেউ অবসর গ্রহণের দীর্ঘ দিন পর পর্যন্ত রায় লেখা অব্যাহত রাখেন, যা আইন ও সংবিধান পরিপন্থী।’

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সবচেয়ে আলোচিত রায় হচ্ছে ত্রয়োদশ সংশোধনী বিষয়ক রায়। অবসরে গিয়েই এ রায় লিখেছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক। এ রায়ের মাধ্যমে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়। পরে রায়ের আলোকে ২০১১ সালের ৩০ জুন সংবিধান থেকে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে চালু করা নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাও বাতিল করে আওয়ামী লীগ সরকার।

সংশ্লিষ্টরা সংবিধানের এ সংশোধনীকে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কটের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন। এ ছাড়া বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ফতোয়াবিষয়ক একটি রায়ও লিখেছেন অবসরে গিয়ে। ২০১১ সালে ১২ মে প্রধান বিচারপতি থাকাকালে তিনি এ বিষয়ে রায় ঘোষণা করেছিলেন। পরে এর পূর্ণাঙ্গ কপি বের হয় ২০১৫ সালের ২৫ জানুয়ারি। কিন্তু এর আগেই তিনি অবসরে যান।

জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে গত ৩১ ডিসেম্বর। এর আগে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মো: মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের একটি বেঞ্চ এ মামলার রায় দেন।

এ রায় প্রকাশিত হওয়ার পর ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি অবসরে যান বিচারপতি মো: মোজাম্মেল হোসেন। তারও প্রায় এক বছর পর গত ৩১ ডিসেম্বর দেয়া হয় পূর্ণাঙ্গ রায়। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, সাবেক এ প্রধান বিচারপতি এখনো বহু মামলার রায় লিখছেন। রায় লিখছেন অবসরে যাওয়া আপিল বিভাগের বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকও। এখনো তার বহু রায় লেখা বাকি থাকলেও তিনি ইতিমধ্যে বিভিন্ন টেলিভিশন টকশো ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করছেন।

বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময় দেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এবং সুপ্রিম কোর্ট বার বক্তব্য-বিবৃতি দিয়ে আসছিল। এখন স্বয়ং প্রধান বিচারপতি এ ধরনের কার্মকাণ্ডকে সংবিধান পরিপন্থী বলে বিবৃতি দিয়েছেন। এ নিয়ে দেশের রাজনৈতিক ও বিচারাঙ্গনসহ বিভিন্ন মহলে তুমুল আলোচনা চলছে।

এদিকে প্রধান বিচারপতির বিবৃতি বিষয়ে সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রফিক-উল হক গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘প্রধান বিচারপতির বক্তব্যে ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায় অবৈধ হয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল থাকে । এটা ফিরে আসবে।’

প্রধান বিচারপতির বিবৃতিকে সমর্থন জানিয়ে বুধবার  সংবাদ সম্মেলন করেছে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন। সম্মেলনে বারের সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতিসহ বিচারপতিগণের নিয়োগপ্রাপ্তির পর সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী শপথ গ্রহণপূর্বক তার দায়িত্বভার গ্রহণ করতে হয়। বিচারক হিসেবে বাংলাদেশের সংবিধান, আইনের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধানের যে শপথ বিচারক হিসেবে গ্রহণ করেন অবসরের পর তিনি আর ওই শপথের আওতায় থাকেন না।’

এ সময় তিনি আরো বলেন, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের তরফ থেকে আমরা বারবার এ বিষয়টি বলে এসেছি। এখন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বক্তব্যে এটি আরো স্পষ্ট হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংবিধানের পরিপন্থী বলে যে রায়টি দিয়েছিলেন, তা তিনি স্বাক্ষর করেন তার অবসরে যাওয়ার প্রায় ১৬ মাস পর। তাই ওই রায়ের কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই এবং তা অবৈধ। বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার ওই রায়ের সুযোগে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী দ্বারা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বিলুপ্ত করেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আজকে সুষ্ঠু নির্বাচনের অভাবে যে সঙ্কট, অস্থিরতা ও হানাহানি চলছে তার একমাত্র কারণ, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনপদ্ধতি বাতিল করে ক্ষমতাসীন দলের অধীনে নির্বাচন। আর এ বাতিলের পেছনে রয়েছে এ বি এম খায়রুল হকের সংবিধান পরিপন্থী অবৈধ রায়। তাই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল করে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সঙ্কট নিরসন করার জন্য ক্ষমতাসীন দলের কাছে দাবি জানাচ্ছি।

সুপ্রিম কোর্টের সাবেক রেজিস্ট্রার ইকতেদার আহমেদ বলেছেন, কোনো বিচারপতি অবসরে গেলে তিনি শপথ থেকে মুক্ত হয়ে যান। সে ক্ষেত্রে তার পক্ষে রায় লেখা এবং তাতে স্বাক্ষর করার কোনো সুযোগ নেই। তা ছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধি, দেওয়ানি কার্যবিধি, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রুল ও হাইকোর্ট বিভাগের রুলে স্পষ্ট বলা আছে, যেকোনো মামলার রায় অবশ্যই প্রকাশ্য আদালতে ঘোষণা করতে হবে এবং প্রকাশ্য আদালতে রায়ে স্বাক্ষর দিতে হবে। এখন কোনো প্রধান বিচারপতি বা অন্য কোনো বিচারক অবসরে গেলে তার পক্ষে প্রকাশ্য আদালতে রায় ঘোষণা বা তাতে স্বাক্ষর করার সুযোগ কোথায়? আমি মনে করি, প্রধান বিচারপতি যা বলেছেন তা সঠিক।

বিশিষ্ট সংবিধান বিশ্লেষক ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগের শিক্ষক ড. শাহদীন মালিক  বলেন, আগে বিচারপতিরা তাদের মেয়াদকালেই রায় লেখা শেষ করতেন। তাই অবসরে যাওয়ার আগেই রায় লেখা শেষ করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন’ প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বক্তব্য অনুযায়ী বর্তমান সরকার ও তাদের কর্মকাণ্ড অবৈধ  এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল হয়ে যায়।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বক্তব্য অনুযায়ী পঞ্চদশ সংশোধনী অবৈধ। অবসর গ্রহণের পর যে রায় লেখা হয় তা বে আইনি এবং অসাংবিধানিক।’ সূত্র : শীর্ষনিউজ

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন