গুঞ্জন মধ্যবর্তী নির্বাচনের

সময় বাংলা ডেস্ক :

noya digonto picসাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশে মধ্যবর্তী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আবারো গুঞ্জন শুরু হয়েছে বিভিন্ন মহলে। গত বৃহস্পতিবার একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে জাতীয় পার্টির নবনিযুক্ত কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী একটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিকে যেতে পারেন কারণ বর্তমান অবস্থা নিয়ে স্বস্তিবোধ করছেন না তিনি। তার এ বক্তব্য প্রকাশিত হওয়ার দিনই সিলেটের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নৌকার পক্ষে ভোট চেয়েছেন। উপস্থিত জনতাকে তিনি হাত উঁচু করে নৌকার পক্ষে ভোট দেয়ার জন্য ওয়াদা করিয়েছেন। অপর দিকে জাতীয় পার্টির সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডকেও কেউ কেউ মধ্যবর্তী নির্বাচনের সাথে সম্পর্কিত বলে মনে করছেন। গতকাল শুক্রবার প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বলেছেন, বিএনপির বিকল্প হিসেবে তারা রাজনীতিতে আবির্ভূত হতে চান। সত্যিকার বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতের পদ থেকে পদ্যতাগ করার কথাও জানিয়েছেন। এ ছাড়া আগামী এপ্রিলে কাউন্সিলের পর তার দলের তিনজন মন্ত্রীও সরকার থেকে পদত্যাগ করতে পারেন।
তবে মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে যে গুঞ্জন শুরু হয়েছে তার পক্ষে অনেকে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে যোগ করতে চান সিলেটের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক নৌকার পক্ষে ভোট চাওয়াকে।
সাম্প্রতিক এসব ঘটনা মধ্যবর্তী নির্বাচনের কোনো ইঙ্গিত বহন করে কি না জানতে চাওয়া হয় কয়েকজন সমাজ ও রাজনীতি বিশ্লেষকের কাছে। তাদের মতে বর্তমান সরকারের অধীনে যদি কোনো মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ও তবে তা তাদের ক্ষমতাকে সুসংহত করার লক্ষ্যেই হবে। বর্তমান সরকার কর্তৃক এমন কোনো নির্বাচন আয়োজনের আশা করা যায় না যার মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসবে। মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে গুঞ্জন চললেও সর্বশেষ পৌর নির্বাচন এবং তার আগে তিন সিটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতার আলোকে সাধারণ মানুষের অনেকের মধ্যে তেমন আগ্রহ লক্ষ্য করা যায় না নির্বাচন নিয়ে। তা ছাড়া নির্বাচন হলে তা কি বর্তমান সরকারের অধীনেই হবে না কি অন্য কোনো ব্যবস্থার অধীনে হবে তার সুরাহা হয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়নি বিএনপি জামায়াতসহ আরো অনেক দল।
তারপরও বর্তমানে মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে গুঞ্জনের পরিপ্রেক্ষিতে অনেকে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, জাতীয় নির্বাচন হলে তা বর্তমান অস্বস্তিকর পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের মতে দেশে একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন হওয়া উচিত। কারণ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি তো আর সত্যিকারের ভোট হয়নি। তাই দেশে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হওয়া দরকার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের সাবেক প্রফেসর রাজনীতি বিশ্লেষক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, যে পদ্ধতিতেই বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসুক না কেন বাস্তবতা হলো বর্তমানে তাদের অবস্থান সুসংহত। সরকারের বৈধতা, গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে কিন্তু তা সত্ত্বেও সরকারের ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি করা যায়নি এবং চাপ সৃষ্টি করার মতো কোনো শক্তি দেশে বিদ্যমান নেই। তাই সরকার যদি এ অবস্থায় মধ্যবর্তী কোনো নির্বাচন দেয়ও তবে তা তাদের অবস্থানকে আরো সংহত এবং ক্ষমতাকে আরো দীর্ঘমেয়াদী করার জন্যই হবে বলে মনে করেন প্রফেসর ড. মাহবুব উল্লাহ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রফেসর এম শাহীদুজ্জামান বলেন, সিলেটের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক নৌকা মার্কার পক্ষে ভোট চাওয়ার ঘটনা অবশ্যই তাৎপূর্যপূর্ণ। বর্তমানে সরকার খুব শক্ত অবস্থানে আছে। বিপরীতে বিএনপি রয়েছে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে। তাই সরকার যদি তাদের অধীনে এখনই একটি জাতীয় নির্বাচন করিয়ে নিতে পারে তাতে তাদের বৈধতা এবং গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে যে প্রশ্ন রয়েছে তার যেমন উত্তোরণ ঘটবে তেমিন আগামী ৫ বছরের জন্য তাদের ক্ষমতায় থাকা নিশ্চিত হবে। তাই সুবিধা মতো সময়ে তারা মধ্যবর্তী নির্বাচন করতেই পারে। তিনি বলেন, বর্তমানে সংসদে বিরোধী দল বলতে কিছু নেই। এটা সরকারের জন্য অস্বস্তিকর অবশ্যই। তারা যদি বিএনপিকে নির্বাচনে এনে সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসাতে পারে সেটা সরকারের জন্য অনেক স্বস্তিদায়ক হবে অবশ্যই ।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির আগে থেকেই একটি অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচনের পক্ষে প্রকাশ্যে নানা ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। তবে প্রতিবেশী একটি দেশ ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেয়ায় তাদের সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। বিএনপি ও জামায়াতসহ কয়েকটি দলের অংশগ্রহণবিহীন সে নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়। এরপরে দেশে-বিদেশে এ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা এবং সরকারের বৈধতা নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। নানা বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবেলা করে সরকার গত দুই বছর অতিক্রান্ত করলেও এর মধ্যে বেশ কয়েকবার নির্বাচন এবং দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ে নানা ধরনের গুঞ্জন তৈরি হয়। নির্বাচনের ব্যাপারে বেশ কয়েকবার আশাবাদ তৈরি হলেও সর্বশেষ সিটি নির্বাচন এবং পৌর নির্বাচনে ভোটের নামে যে নৈরাজ্যকর চিত্র জনগণ প্রত্যক্ষ করেছে তাতে নির্বাচন বিষয়ে মোহভঙ্গ হয়েছে অনেকের।
এ দিকে মধ্যবর্তী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে দেশে যখন গুঞ্জন চলছে তখন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার একটি বিবৃতি আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অবসরে যাওয়ার দীর্ঘ দিন পরও রায় লেখাকে তিনি আইন ও সংবিধান পরিপন্থী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার এ বিবৃতি আইন ও বিচার অঙ্গনে ঝড় সৃষ্টি করেছে। কারণ সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায় লিখেছেন অবসরে যাওয়ার ১৬ মাস পর। সংবিধানে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল। বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক প্রধান বিচারপতির পদ থেকে অবসরে যাওয়ার পর সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী সংক্রান্ত রায় লেখেন। এ কারণে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন এবং বিভিন্ন মহল থেকে এ রায়কে অবৈধ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। অবসরে গিয়ে রায় লেখাকে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা কর্তৃক আইন ও সংবিধানপরিপন্থী হিসেবে আখ্যায়িত করার পর কোনো কোনো আইনজীবী বলেছেন, এর ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আবার ফিরে আসতে পারে যা বাংলাদেশে পরপর কয়েকটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। অনেকের মতে বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে নির্বাচনকেন্দ্রিক যে রাজনৈতিক সঙ্কট তার মূলে রয়েছে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তকরণ।

সূত্র : নয়া দিগন্ত

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন