অবক্ষয়ের বলি অসহায় শিশুরা

19216 naya digonto picসময় বাংলা ডেস্ক :  সমাজের সব ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়া নৈরাজ্য, অবক্ষয় এবং বিশৃঙ্খলার বলি হচ্ছে অসহায় শিশুরা। শিশুদের ওপর একের পর এক ঘটে চলেছে পৈশাচিক ঘটনা। এর যেন কোনো শেষ নেই। কয়েক দিন পরপরই শিশু হত্যার ঘটনায় স্তম্ভিত হচ্ছে গোটা জাতি। প্রতিদিন নিত্য নতুন মাত্রায় উন্মোচিত হচ্ছে সমাজের বিকৃত চেহারা। সেই সাথে বেরিয়ে পড়ছে সমাজ, রাষ্ট্র এবং মানবিকতার অধঃপতনের ভয়াবহ চিত্র। গাছের সাথে বেঁধে দলবেধে পিটিয়ে হত্যা, পুড়িয়ে হত্যা, শ্বাস রোধ করে হত্যা, হাত-পা বেঁধে পানিতে ফেলে শিশু হত্যার ঘটনা ঘটছে অহরহ দেশের আনাচে কানাচে। নিখোঁজ এবং অপহরণের কয়েক দিন পর কখনো পানিতে ভাসমান, কখনো জঙ্গলে আবার কখনো বা বালু চাপা লাশ মিলছে অসহায় শিশুদের। এরই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ বুধবার হবিগঞ্জের বাহুবলে নদীর চরে বালুর নিচে মিলল চারটি অসহায় শিশুর লাশ। নিখোঁজ হওয়ার ছয় দিনের মাথায় তাদের লাশের সন্ধান পেল পরিবার। শিশুদের প্রতি চলমান বর্বরতায় উদ্বেগ উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে সমাজের সর্বস্তরে। আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন অনেক মা-বাবা। ভয়ভীতি আর নিরাপত্তাহীনতা কুরে কুরে খাচ্ছে অনেককে।
নির্মম বর্বরতার শিকার শিশুদের ক্ষেত্রে কখনো কখনো পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক প্রভৃতি ক্ষেত্রে বিদ্যমান দ্বন্দ্ব সঙ্ঘাত এবং প্রতিহিংসার জের লক্ষ্য করা যায়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে এগুলো খুবই ুদ্র কারণ। তাদের মতে আমরা একটি অস্বাভাবিক সমাজে বাস করছি। রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি সব ক্ষেত্রেই যে বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য, প্রতিহিংসা এবং নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা চলছে তারই ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ আমরা বিভিন্নরূপে দেখতে পাচ্ছি এখন। আইন, নিয়মনীতি এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নষ্ট হয়ে গেছে মানুষের। তাদের মতে যত দিন পর্যন্ত ওপরতলায় আইন, নিয়মনীতি এবং শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত না হবে ততদিন পর্যন্ত সাধারণ স্তরে এসব প্রতিষ্ঠিত হবে না; বরং আরো ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়বে এসব নৈরাজ্য এবং পাশবিক উন্মত্ততা। কেউ কাউকে পরোয়া করবে না। বিশেষজ্ঞদের মতে জোর যার মুল্লুক তার তন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়া, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং এর পাশাপাশি বস্তুগত উন্নতির সাথে সাথে নৈতিক মানবিকতার বিকাশের ঘাটতি এবং আদর্শবাদের পতনের ফলে একের পর এক এ জাতীয় ঘটনা ঘটছে। কারো কারো মতে বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা, গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের অনুপস্থিতি প্রভৃতি কারণে সমাজের সবক্ষেত্রে যে বিশৃঙ্খলা এবং অনিয়ম ছড়িয়ে পড়েছে তারই ফলে ঘটছে এ জাতীয় অমানবিক ঘটনা।
বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, আইন ও নিয়মনীতি না মানার ফলে যে বিশৃঙ্খলা চলছে তারই বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এসব ঘটছে। সব ক্ষেত্রেই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো এবং আইন ও নিয়ম কানুনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ চলে গেছে। ফলে সমাজ বিশৃঙ্খল হয়ে উঠছে।
অন্যান্য ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়া বিশৃঙ্খলার মতো সমাজে সার্বিক বিশৃঙ্খলা হিসেবে এসব ঘটনা ঘটছে। এটা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. শাহ এহসান হাবীবের মতে আজকের এ ঘটনাগুলোর কারণ এক দিনে জন্ম হয়নি। আমাদের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি সব ক্ষেত্রেই প্রতিহিংসা এবং নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সামাজিক বৈষম্য, অন্যায্যতা, দুর্নীতি, বিচারহীনতা এবং অপরাধ করেও শাস্তি না পাওয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠছে তারই ভিন্ন ভিন্ন রূপ এখন বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রকাশিত হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমানের মতে আমরা একটি অস্বাভাবিক সমাজে বাস করছি। অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলেছি আমরা। অনেক বড় বড় ভুল আমরা করছি। অনিয়ম করেও পুরস্কৃত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। আমরা অধঃপতনের দিকে যাচ্ছি। যেসব ভয়ঙ্কর নির্মম ঘটনা আমরা দেখছি, এর ফলে সমাজে আরো বেশি করে নৈরাজ্য, অস্থিরতা, আস্থাহীনতা বাড়বে।
একই বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর এস এম আবুল কালাম আজাদ বলেন, প্রায় ক্ষেত্রেই সমাজে নানা স্তরে চলমান দ্বন্দ্ব সঙ্ঘাত, লোভ এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিশোধপরায়ণতার শিকার হচ্ছে শিশু এবং নারী। কারণ শিশুরা সবচেয়ে বেশি অসহায়। তাই অনেক ক্ষেত্রে তাদের বেছে নেয়া হয়। জোর যার মুল্লুক তার অবস্থা চলছে। অনেক ক্ষেত্রে বড়রাই নিয়ম মানছে না। আইনের শাসনের অভাবে একজন অপরাধী জানছে তার শাস্তি হবে না। ফলে সে নির্বিঘেœ অপরাধ করছে। দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার চলছে। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের বিকাশ হয়েছে এবং হচ্ছে কিন্তু নৈতিকতার বিকাশ হচ্ছে না। এটা সুস্থ বিকাশ নয়। বস্তুগত উন্নতি আর মানবিক উন্নতির মধ্যে অনেক ব্যবধান তৈরি হয়েছে। উন্নতি হচ্ছে নানা ক্ষেত্রে কিন্তু বিপরীতে সমাজে বৈষম্য বেড়েছে অনেক। নির্মমতার যেসব চিত্র সামনে আসছে তা ভবিষ্যতের জন্য খুব বিপজ্জনক বলে আখ্যায়িত করেন তিনি।
অবক্ষয়ের কয়েকটি চিত্র : গতকাল বৃহস্পতিবার দুইটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত শিশু নির্যাতনের খবরের শিরোনাম এখানে উল্লেখ করা হলো যা থেকে সহজেই অনুমান করা যায় আমরা কোন সমাজে বাস করছি।
গতকাল দেশের সব পত্রিকায় আলোচিত খবর ছিল বাহুবলে মাটিচাপা চার শিশুর লাশ উদ্ধারবিষয়ক। এ ছাড়া শিশু হত্যা এবং শিশু নির্যাতনবিষয়ক আরো কয়েকটি খবরের শিরোনাম হলো (১) শিশু সোলায়মানকে দোকানের ভেতর শ্বাসরোধে হত্যা গাজীপুরে : আসামির স্বীকারোক্তি। (২) ধামরাইয়ে পলিথিনের ব্যাগে শিশু উদ্ধার। (৩) পবায় শিশু নির্যাতন : প্রধান আসামিসহ আরো তিনজনের জামিন। (৪) বগুড়ায় অপহৃত শিশু উদ্ধার : অপহরণকারী গ্রেফতার। (৫) মান্দায় ১৬ বছরের শিক্ষাথীকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা।
একটি পত্রিকায় প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা যায়, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যালের এক ডোম কোদাল দিয়ে এক নবজাতকের লাশ নিয়ে যাচ্ছে। পাশের আরেকটি ছবিতে দেখা যায় আবজর্ননার স্তূপে ডোম ফেলে দিয়েছে নবজাতকের লাশটি।
গত দেড় মাসে শিশুদের ওপর বর্বরতার চিত্র : গত ১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর রমনায় সদ্য ভূমিষ্ঠ ছেলে সন্তানকে চারতলা থেকে ছুড়ে ফেলে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। নবজাতকের মায়ের নাম বিউটি (১৫)। তিনি গৃহকর্মীর কাজ করেন। রমনার বেইলী রোডের আবাসিক এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। রমনা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আমিনুল ইসলাম জানান, বিউটি তার সদ্য প্রসূত ছেলেসন্তানকে মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে চারতলা থেকে ফেলে দেন। বেইলি রোডের পিঠা ঘরের পাশে ২৬ নম্বর প্রপার্টিজ হাউজিংয়ের ছয় তলা ভবনের চার তলায় গৃহকর্তা আজমল হকের বাসায় ৯ বছর ধরে তিনি গৃহকর্মীর কাজ করেন। অবৈধ গর্ভপাতের ফলে বিউটি ওই ছেলে সন্তনের মা হন। একই দিন গোপালগঞ্জে এক শিশুকে হত্যা করে তার মা।
৩ ফেব্রুয়ারি বরিশালের গৌরনদীতে কবিতা নামে এক শিশু ও পঞ্চগড়ে আম্বিয়া নামে এক শিশুর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
গত ১৪ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের কাশিমপুর এলাকায় সোলায়মান নামে চার বছরের এক শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়।
নির্মল আদালতে স্বীকার করেছে তার দোকানে ঢুকিয়ে সোলায়মানকে শ্বাস রোধ করে হত্যা করে সে। এনজিও থেকে ঋণ নেয়ার ব্যাপারে সোলায়মানের বাবা তার জামিনদার হতে অস্বীকার করায় সে সোলায়মানকে হত্যা করে বলে জানায়।
একই দিন পাবনায় দুই শিশুকে বিষ খাইয়ে হত্যার পর আত্মহত্যা করে এক নারী।
৮ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের ছাতকে ১০ বছরের এক শিশুর গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই দিন মৌলভীবাজারের এক নবজাতকের লাশ পাওয়া যায়।
গত ২ ফেব্রুয়ারি কেরানীগঞ্জে স্কুলছাত্র আবদুল্লাহর লাশ উদ্ধার করা হয়।
গত ৩ জানুয়ারি ঝিনাইদহের শৈলকুপার কবিরপুর মসজিদপাড়ায় তিন শিশুকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। পারিবারিক কলহের জের ধরে ইকবাল হোসেন নামে এক ব্যক্তি নিজের ভাই ও বোনের তিন সন্তানকে পুড়িয়ে হত্যা করে। নিহত শিশুরা হলো আমিন হোসেন (৭), শিবলু হোসেন (৯) ও মাহিম হোসেন (১৩)। আমিন হোসেন প্রথম শ্রেণী, শিবলু তৃতীয় শ্রেণী ও মাহিম সপ্তম শ্রেণীতে পড়ত। ইকবালকে প্রতিবেশীরা আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে। সে সিঙ্গাপুর থাকত। সিঙ্গাপুর থেকে ভাই দেলোয়ারের কাছে টাকা পাঠাত। দেশে এসে ওই টাকা ফেরত চায় সে। দেলোয়ার টাকা না দেয়ায় সে তিন শিশুকে হত্যা করে।
গত ৫ জানুয়ারি এক দিনেই দেশে ছয় শিশুকে হত্যা করা হয়। এর মধ্যে গাজীপুরের টঙ্গীতে চোর সন্দেহে মোজাম্মেল হক নামে এক শিশুকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ঢাকায় রানা নামে এক শিশুকে বিষ খাইয়ে হত্যা করে তার সৎ বাবা। আর চট্টগ্রামে ছুরিকাঘাতে নিহত হয় আজিম হোসেন। সিলেট ও যশোরে অপহরণের পর সালমান ও লিমাকে হত্যা করা হয়।
নিখোঁজের এক মাস পর গাজীপুরে ৯ জানুয়ারি রাব্বি হোসেন নামে তিন বছরের এক শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। একইভাবে নিখোঁজের পর কুমিল্লøার তাহমিনা ও মনিকা, গাইবান্ধার মশিউর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লায়লা হোসেন ও তাসলিমা বেগম, নাটোরের খানজাহান ও নরসিংদীর তাপস বিশ্বাসের লাশ উদ্ধার করা হয়।
১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের ২ নম্বর বাবুরাইলে পাঁচজনকে হত্যা করা হয়। তাদের মধ্যে শান্ত (৫) ও সুমাইয়া (৫) নামে দুই শিশুও ছিল।
১৯ জানুয়ারি কক্সবাজারের রামুর বড়বিল গ্রামের একটি ফলের বাগান থেকে মোহাম্মদ শাকিল (১০) ও মোহাম্মদ কাজল (৯) নামে দুই সহোদরের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
২৪ জানুয়ারি রামপুরা এলাকার শিশু গৃহকর্মী মুন্নী আক্তারকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
২৮ জানুয়ারি ধামরাইয়ের শাকিল (১২) ও ইমরান (১০) নামে দুই স্কুলছাত্রের লাশ উদ্ধার করা হয়। টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের মোড়ভাঙ্গা গ্রামের একটি লেবুতে থেকে তার লাশ উদ্ধার হয়। পুলিশ ও পরিবার বলছে, মুক্তিপণের টাকা না পেয়ে তাদের হত্যা করা হয়।
৩০ জানুয়ারি মুন্সীগঞ্জ সদরের মালির পাথর এলাকার একটি পরিত্যক্ত ঘর থেকে নীরব (১১) নামে এক মাদরাসাছাত্রের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নীরব মালিরপাথর মাদরাসায় পড়ত। ২৯ জানুয়ারি খেলার সময় সে নিখোঁজ হয়।
২৮ জানুয়ারি শুক্রবার রাতে রংপুর নগরের আদর্শপাড়া থেকে রাহিমুল ইসলাম রনক (১১) নামে এক শিশুর বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করা হয়। অপহরণের প্রায় দুই মাস পর তার লাশ উদ্ধার হয়। মিঠাপুকুর উপজেলার খোড়াগাছ ইউনিয়নের তেপানি গ্রামের একটি জমি থেকে গর্ত খুঁড়ে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।
৩১ জানুয়ারি শেরপুরে নূর আলম নামে এক স্কুলছাত্রের লাশ পাওয়া যায়।
বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য মতে সারা দেশে গত ১৩ মাসে ৩২১টি শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। চলতি বছর জানুয়ারিতে হত্যা করা হয়েছে ২৯টি শিশু। ২০১৫ সালে ২৯২ জন, ২০১৪ সালে ৩৬৬টি শিশু হত্যা করা হয় সারা দেশে।
২০১৫ সালে ২৪০টি শিশুকে অপহরণ করা হয়। এদের মধ্যে ১৬৭টি জীবিত এবং ৪০টিকে মৃত উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া ২০১৫ সালে ৫২১টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। সূত্র : নয়া দিগন্ত

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন