হবিগঞ্জের ৪ স্কুলছাত্রকে খুন করেছে ৬ জন: রুবেল দেওয়া জবানবন্দিতে খুনের নৃশংস বর্ণনা

20216 hobigonjবিশেষ প্রতিনিধি, হবিগঞ্জ: হবিগঞ্জের বাহুবলে ৪ স্কুলছাত্রকে নির্মম ও নৃশংসভাবে খুনের ঘটনায় অংশ নিয়েছিল ৬ জন।  আর পূর্ব বিরোধের জের ধরেই শিশুদের খুনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।  আটক শিশু হত্যা মামলার প্রধান আসামি আব্দুল আলীর ছেলে রুবেল আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে খুনের এই নৃশংস বর্ণনা দিয়েছে।

একসঙ্গে খেলা দেখতে যাওয়া চার শিশুকে মাঠ থেকে বাড়ি নিয়ে আসার কথা বলে তোলা হয় সিএনজি অটোরিকশায়।

এরপরই চেতনানাশক ওষুধ দিয়ে তাদের অজ্ঞান করা হয়। অজ্ঞান অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয় অটোরিকশা গ্যারেজে। সেখানে একে একে গলা টিপে হত্যা করা হয় চারজনকে। হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় ৬ জন। হত্যার পর শিশুদের লাশ গভীর রাতে মাটি চাপা দেয়া হয়।

আদালতে ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দিতে এভাবেই নৃশংস খুনের বর্ণনা দিয়েছে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া রুবেল। লাশ উদ্ধারের পর তাদের গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেয়া হয়েছিল।

গত রাতে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কৌশিক আহমেদ খোন্দকারের আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয় রুবেল।

হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার জয়দেব কুমার ভদ্র শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টায় তার কার্যালয়ে ব্রিফিংকালে জানান, সুন্দ্রাটিকি গ্রামে বাগাল পঞ্চায়েত এবং তালুকদার পঞ্চায়েতের বিরোধকে কেন্দ্র করেই এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এক মাস আগে বাগাল ও তালুকদার পঞ্চায়েতের মাঝে উভয় পঞ্চায়েতের সীমানায় থাকা একটি বরই গাছ কাটা নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। পরে বিষয়টি সামাজিকভাবে নিষ্পত্তি করা হলেও সিএনজি চালক বাচ্চু মিয়া ও গ্রেপ্তারকৃত আরজু সামাজিক হেয় প্রতিপন্ন হয়। এর পর থেকেই তারা পরিকল্পনা করে বাগাল পঞ্চায়েতের শিশুদের হত্যা করার। রুবেলের জবানবন্দির তথ্য তুলে ধরে পুলিশ সুপার বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার বিকালে পূর্ব ভাদেশ্বর গ্রামে ৪ শিশু ফুটবল খেলা দেখতে যায়। বৃষ্টির জন্য খেলা না হওয়ায় শিশুরা মাঠে ঘুরাফেরা করছিল। তখন আগ থেকে ওত পেতে থাকা বাচ্চু মিয়া তাদেরকে বাড়িতে নিয়ে যাবে বলে সিএনজি-অটোরিকশায় উঠতে বলে। ৪ শিশু সিএনজি-অটোরিকশায় উঠলে তাদের চেতনানাশক পুশ করে অজ্ঞান করে বাচ্চু মিয়ার গ্যারেজে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আরজু ও রুবেলসহ ৬ জন মিলে তাদেরকে গলা টিপে হত্যা করে। হত্যার পর লাশগুলো গ্যারেজেই লুকিয়ে রাখা হয়। পরে গভীর রাতে যে স্থান থেকে লাশগুলো উদ্ধার করা হয় সেখানে গর্তে পুঁতে রাখা হয়।

পুলিশ সুপার জানান, ঘটনার আলামত উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে বাচ্চুর ব্যবহৃত, সিএনজি-অটোরিকশা, আরজুর বাড়ি থেকে কোদাল আর শাবল, রাস্তা থেকে কয়েকটি বস্তা এবং একটি রক্তমাখা পাঞ্জাবি উদ্ধার করা হয়েছে। আরজুর স্বীকারোক্তির মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের ঘটনার মুটিভ উন্মোচিত হয়েছে। তবে একজনের স্বীকারোক্তিই শেষ কথা নয়। সে কাউকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে পারে। তাই তদন্ত অব্যাহত থাকবে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অভিযোগভিত্তিক তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে। প্রাথমিক তদন্তে ৬ জনের নাম এলেও এর মধ্যে রুবেল এবং আরজু গ্রেপ্তার হয়েছে। অন্যরা এখনও গ্রেপ্তার হয়নি। আরজুকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আরজু, রুবেল ছাড়াও গ্রেপ্তারকৃত বশিরের ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে। সোমবার রিমান্ড শুনানি হবে। গ্রেপ্তারকৃত ৫ আসামিকে রিমান্ডে নিলেই প্রকৃত তথ্য পরিষ্কার হবে।

পুলিশ সুপার বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি ঘটনার সময় সুন্দ্রাটিকি গ্রামের আবদুল আহাদ ৪ শিশুকে বাচ্চু মিয়ার সিএনজি-অটোরিকশায় দেখেছে বললেও পরে অস্বীকার করে। ফলে পুলিশ বিভ্রান্ত হয়েছে। নিহতদের পরিবারের অভিযোগ এবং পুলিশের কৌশল ব্যবহার করে ঘটনার মোটিভ উদ্ধার করা হয়। সুন্দ্রাটিকি গ্রামে ডিবি, ডিএসবিসহ ৫০ জন পুলিশ সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা নজরদারি করে সফল হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি মিডিয়ারও প্রচুর কষ্ট হয়েছে। একজনের জবানবন্দি পূর্ণাঙ্গ তথ্য দেয় না। তবে এই জবানবন্দি ঘটনার রহস্য উদঘাটনের ভিত্তি হিসাবে কাজ করবে।

এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার বলেন, ঘটনার জন্য পুলিশের কোনো সদস্যের গাফিলতি রয়েছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ব্যাপারে তদন্ত চলছে। যদি কোনো অভিযোগ পাওয়া যায় তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এদিকে সিলেটের ডিআইজি মিজানুর রহমান পিপিএম বলেছেন, গ্রেপ্তারকৃত ৫ জনই কমবেশী এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত।

শুক্রবার বিকালে পুলিশ সুপারের সভাকক্ষে এক সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মামলার তদন্ত করতে। এই ঘটনায় ৫ জন গ্রেপ্তার হলেও এর পিছনে আরও কোনো গডফাদার জড়িত আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন